মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৫

এক সংগ্রামী নেতা: আলিজা ইযতবিগোভিচ

কৈশোরের শুরুতে একবার নানাবাড়ী বেড়াতে যেয়ে বড় মামার ব্যাক্তিগত সংগ্রহশালার অসংখ্য বইয়ের ভীড়ে খুজে পাই ”বলকানের কান্না” নামের সাইমুম সিরীজ এর একটি বই। এই বইতেই প্রথম পড়েছিলাম যে যুগোশ্লাভিয়া নামক দেশটির কয়েকটি অঞ্চল মুসলিম সংখ্যাগরিস্ঠ এবং এই দেশটির আছে সম্বৃদ্ধ ইসলামি ঐতিহ্য।

সোভিয়ত ইউনিয়নের পতনের পর ইউরোপে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। এ সময় যুগোস্লাভিয়াতে মার্শাল জোসেফ  টিটোর লৌহকঠিন শাসন ও কম্যুনিষ্ট শাসন এর শোষন আর অত্যাচার এর প্রতিবাদে মাথা তুলল এর প্রদেশ গুলি। যার একটি বসনিয়া-হারজেগোভিনা। কিন্তু সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অন্য প্রদেশগুলির স্বাধীনতা নিয়ে তথাকথিত মানবতাবাদী রাষ্ট্রগুলির বিশেষ মাথাব্যাথা না থাকলেও তাদের সমর্থনে বসনিয়ার স্বাধীনতা কে দমন করতে উঠে পরে লাগল সাবেক যুগোস্লাভিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র সার্বিয়া। কারন ছিল একটাই বসনিয়াতে মুসলিম জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেসময় প্রতিদিন সংবাদ এর একটা বড় অংশ জুড়েই থাকত বসনিয়ার যুদ্ধ। আসলে যার বড় অংশই ছিল মুসলিম দের উপর পরিচালিত গনহত্যার সংবাদ। আর তখনই সমগ্র বিশ্ব পরিচিত হয়ে উঠে একটি নাম এর সাথে। আলিজা ইযত বিগোভিচ। স্বাধীন বসনিয়া-হারজেগোভিনার প্রেসিডেন্ট ও জনমানুষের নেতা। সেই সাথে আধুনিক যুগে ইসলাম বিষয়ে অন্যতম প্রধান গবেষক ও দার্শনিক।

আলিজা ইযতবিগোভিচ এর জন্ম ১৯২৫ সালের ৮ই আগষ্ট উত্তর বসনিয়ার একটি ছোট নগরী বসনিয়াক সামাচ এ। পিতা মুস্তাফা ও মা হীবা ইযতবিগোভিচ। তিনি ছিলেন বসনিয়াক মুসলিম। অর্থাৎ স্থানয় বসনিয় অরিজিন এর মানুষ যারা তুর্কি শাসনামলে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিল। তার দাদার নামও ছিল আলিজা। তিনি একসময় সেই শহরটির মেয়র ছিলেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই নগরিতে থাকা অনেক সার্বিয়ান এর প্রান বাঁচিয়েছিলেন। পিতা মুস্তফা ছিলেন একাউন্টেন্ট। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত হওয়ার কারনে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ১৯২৭ সালে তিনি তার পরিবার এর সাথে বসনিয়ার রাজধানি সারায়েভো তে চলে যান। সেখানে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। বসনিয়া তখন সার্ব সাম্রাজ্য এর অধিনে একটি সায়ত্বশাসিত দেশ। স্কুল জীবনের শেষদিকে শুরু হয় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময় তিনি যোগদেন ”ইয়ং মুসলিম” নামে একটি সংগঠনে। বসনিয়া এ সময় জার্মানির নিয়ন্ত্রনে চলে যায় এবং একটি শায়ত্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে থাকে। সার্ব সাম্রাজ্যের বিরোধী হিসাবে ”ইয়ং মুসলিম” এবং আলিয়া ইযতবিগোভিচ জার্মান নাজি দের সমর্থন করতেন। ১৯৪৪ সালে সার্বিয় জাতিয়তাবাদী বলকান মিলিশীয়াদের হাতে বন্দি হন তিনি। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার দাদার অবদান এর স্বীকৃতি দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তিনি আবার কম্যুনিষ্টদের হাতে বন্দি হন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় মার্শাল জোসেফ টিটোর নেতৃত্বে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রদেশগুলিতে কম্যুনিষ্ট শাসন কায়েম হয়। টিটো জোর করে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠার নামে নাস্তিকতার প্রচলন করেন এবং মুসলিমদের উপর অত্যচার শুরু করেন। কম্যুনিষ্ট পার্টির বিরোধিতা করায় আলিজা ইযত বিগোভিচ কে তিন বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন এবং কর্মজীবন শুরু করেন। কঠোর কম্যুনিষ্ট শাসন এর মধ্যেও তিনি ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করতেন। বসনীয় হিসেবে তিনি সার্বিয় প্রধান তথাকথিত যুগোস্লাভিয়ার সরকার এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদে অংশ নিতেন। ১৯৭০ সালে তিনি লিখেন তার অন্যতম বিখ্যাত বই ”ইসলামিক ডিক্লারেশন”। বইটি প্রকাশিত হলে ইউরোপ এবং বিশ্বে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন। বইটিতে তিনি ইসলামি ও আধুনিক রাষ্ট্র বিষয়ে বিষয়ে নতুন ধারনা উপস্থাপন করেন এবং এটি প্রমান করেন যে আধুনিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্র কোন অসম্ভব বিষয় নয়। ১৯৮৩ সালে এই বইটি লিখার জন্য কম্যুনিষ্ট আদালত তাকে চোদ্দ বছর এর কারাদন্ড দেয়। পাঁচবছর কারাগারে কাটিয়ে ১৯৮৮ সালে কম্যুনিষ্ট পার্টির পতন এর পর মুক্তি পান।

মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তার সমমনা দের নিয়ে গঠন করেন পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক একশন। বসনিয় ভাষায় যার সংক্ষিপ্ত নাম এসডিএ। এসডিএ ছিল প্রধানত মুসলিমদের নিয়ে গঠিত দল। ১৯৯০ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রদেশগুলিতে প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে এসডিএ ৪৪ শতাংশ সমর্থন লাভ করে। সেসময় এর নিয়ম অনুসারে বসনিয়াতে ছিল সাত সদস্য এর একটি প্রেসিডেন্সি। যার দুইজন বসনিয় মুসলিম হতেন। আলিজা প্রেসিডেন্সির সদস্য হন এবং ঐক্যমতের ভিত্তিতে বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯২ সালে পুর্নাঙ্গ স্বাধীনতার প্রশ্নে গনভোট এর আয়োজন করা হয় এবং বসনিয় মুসলিম এবং ক্রোট দের বিপুল ভোটে বসনিয়া স্বাধিন রাষ্ট্র হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে। 

কিন্তু ইউরোপের বুকে একটি স্বাধীন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্রের অস্তীত্ব মেনে নিতে প্রস্তত ছিলনা তথাকথিত সভ্য পাশ্চাত্য। বসনিয়া স্বাধীনতার তীব্র বিরোধী ছিল বসনিয়ায় বসবাসকারি সার্বিয় বংশোদ্ভুত জনগোষ্ঠী। বসনিয়ার স্বাধীনতাকে মেনে না নিয়ে তারা সার্বিয়ার নিয়মিত সশস্ত্রবাহীনির সহায়তায় জোর করে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে খৃষ্টান ক্রোট রাও মুসলিম বসনিয়াক দের সাথে বসবাস করতে বিশেষ উৎসাহী ছিলনা। তারাও এই সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেয়। সামরিক শক্তি বিহীন বসনিয়া পড়ে যায় মহাবিপদে। তথাকথিত আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এই সময় মানবতা বা শান্তির নামে উল্টো বসনিয়ার উপরই আরোপ করে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। এই অবস্থায় সার্ব খৃষ্টানরা বসনীয়ার বিরাট অংশ দখল করে এবং চালায় একাধিক গনহত্যা ও ধর্ষন। সার্বিয়ানরা খোলাখুলি ভাবেই স্বীকার করত যে তাদের হামলার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এথনিক ক্লিনীং তথা বসনিয়ার মুসলিমদের পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়া। এই ভয়ংকর সময়ে দেশকে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিয়ে বসনিয়া ও সারা বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে উঠেন আলিজা ইযতবিগোভিচ।

১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলার পর ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটনে একটি শান্তীচুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুযায়ি বসনিয়ার সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্ট পদে তিন জাতির তিনজন প্রতিনিধি রাখার নিয়ম করা হয়। নতুন নির্বাচনে ও তিনি জয়লাভ করে রাষ্ট্রপতি হন। ২০০০ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বপালন করে স্বাস্থ্যগত কারনে তিনি অবসর নেন। বসনিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠী যারা মূলত বসনিয়ার ভুমিপুত্র তাদের জন্য তার বিশেষ অবদান এর স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বসনিয়ায় ”দিদো” তথা দাদা নামে পরিচিত । ১৯৪৯ সালে হালিদা রিপুভিচ এর সাথে বিয়ে হয় তার। তাদের এক পুত্র বাকির ইযতবিগোভিচ বর্তমানে বসনিয়া প্রেসিডেন্সীর সদস্য। ২০০৩ সালের ১৯ এ অক্টোবর তিনি হৃদরোগে ইন্তেকাল করেন। বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে তাকে দাফন করা হয়।

পশ্চিমা রাষ্ট্র ও মিডিয়া গুলি তাকে তাদের অন্যতম শত্রু বলেই বিবেচনা করত। কারন তিনি কেবল ইউরোপের বুকে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের নেতাই ছিলেন না। ছিলেন একজন উচ্চস্তরের ইসলামি চিন্তাবীদ ও দার্শনিক। তার ”ইসলামিক ডিক্লারেশন” এবং ”ইসলাম বিটুইন ইষ্ট এন্ড ওয়েষ্ট” গ্রন্থদুটির জন্য তিনি বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। ”ইসলাম বিটুইন ইষ্ট এন্ড ওয়েষ্ট” বইতে তিনি অত্যন্ত যুক্তির সাথে এটা প্রমান করেন যে ইসলাম পাশ্চাত্য দৃষ্টিতে প্রচলিত ধর্মের মত কোন ধর্ম নয় বরং একটি পুর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম বর্তমান আধুনিক বিশ্বের উপযোগি নয় বলে যে মিথ্যা পাশ্চাত্য মিডিয়া প্রচার করে থাকে তার যুক্তিপূর্ন জবাব দিয়েছিলেন এই বইতে তিনি। তার এই যুক্তিপুর্ন মতামত এর জন্য অনেক পাশ্চাত্যপন্থীর কাছে তিনি এখনও মৌলবাদী নেতা!

আজ ১৯ এ অক্টোবর তার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তার রুহ এর মাগফিরাত কামনা করছি। 

সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০১৫

ইহুদিবাদী ইসরাইলের অবৈধ জন্মের ইতিকথা।

১৫ই মে  ইহুদিবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠার বার্ষিকী। এ দিনটি ফিলিস্তিনসহ মুসলিম বিশ্বের কাছে ‘নাকাবা দিবস’ হিসেবে পরিচিত। ‘নাকাবা’ অর্থ হলো বিপর্যয়। ১৯৪৮ সালের এ দিনেই আনুষ্ঠানিকভাবে দখলদার ইসরাইল প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এ বিষয়েই এখানে আমরা বিস্তারিত আলোচনার প্রয়াস পাব।

পৃথিবীতে প্রতিনিয়তই ঘটছে নানা পরিবর্তন। কোনো কোনো পরিবর্তনে মানুষ নতুনকরে আশাবাদী হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীতে নৈতিকতা ও মানবিকতার বিকাশ ঘটবে বলে অনেকেই আশা করেছিলেন। ভেবেছিলেন বিশ্বজুড়ে অন্যায় ও অবিচারের মাত্রা কমে আসবে। মানুষ নিজের অধিকারের বিষয়ে সচেতন হওয়ার পাশাপাশি অন্যের অধিকারকেও সম্মান করবে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন শ্লোগানে আন্তর্জাতিক সংস্থার সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেও এ আশা জোরদার হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে এর কিছুই ঘটেনি। আধিপত্যকামীদের ক্ষমতা ও অর্থের লোভ সবকিছুতেই হতাশার ছোয়া লাগিয়ে দিয়েছে। অন্যায় ও জুলুমের পদ্ধতিতে হয়তো পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু তা পুরোদমেই অব্যাহত রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়- ইসরাইলের দখলদারি এবং হত্যা-নির্যাতনে কোন পরিবর্তন আসেনি।

নিঃসন্দেহে গত দুইশ’ বছরের মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধের যেসব ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে সবচেয়ে কষ্টদায়ক হলো- ইহুদিবাদীদের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল। ফরাসি গবেষক রুযে গারুদি বলেছেন, “রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই ইহুদিবাদের উৎপত্তি। ইহুদিবাদীরা তাদের অবৈধ লক্ষ্য হাসিল করতে ইহুদি ধর্মকে অপব্যবহার করছে।” ইহুদিবাদীরা গত কয়েক দশক ধরে ফিলিস্তিনি জাতির ওপর চরম দুঃখ-দুর্দশা চাপিয়ে দিয়েছে। সেখানে চালানো হচ্ছে জাতিগত নিধনযজ্ঞ। ফিলিস্তিন দখল করে সেখানে এমন একটি অবৈধ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকেই সংকটের গভীরে নিক্ষেপ করেছে।

অবৈধ ইসরাইলের কারণে গত ৬৬ বছর ধরে গোটা মধ্যপ্রাচ্যই অশান্তি ও অনিরাপত্তার আগুনে জ্বলছে। এর জন্য সাম্রাজ্যবাদী সরকারগুলোর ক্ষমতালিপ্সাই প্রধান কারণ। ইসলামী জগতের একেবারে কেন্দ্রে ইহুদিদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে সুদূরপ্রসারী অশুভ লক্ষ্য কাজ করেছে, তা বোঝা যায় ইতিহাস ঘাটলেই। ঊনবিংশ শতাব্দির দ্বিতীয়ার্ধে আধিপত্যের বলয় বাড়ানো নিয়ে তিন ইউরোপীয় দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির মধ্যে প্রতিযোগিতা চলছিল। বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তারা নানা অপকৌশল অবলম্বন করছিল। ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের ওপরও তাদের লোলুপ দৃষ্টি ছিল। কারণ ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করেছে এই ফিলিস্তিন। ভৌগলিক দিক থেকে এটি একটি কৌশলগত অঞ্চল। সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্টের শাসনামলে ফিলিস্তিনকে নিজের উপনিবেশে পরিণত করার জন্য ব্যাপক চেষ্টা চালায় ফ্রান্স।

ফ্রান্সের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি টের পেয়ে এক সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা হাতে নেয় ব্রিটেন। এ পরিকল্পনার আওতায় সাম্রাজ্যবাদ ও ইহুদিবাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা সৃষ্টি হয়। এরই আওতায় দখল হয়ে যায় কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যের ধারক ফিলিস্তিন। ওসমানীয় সাম্রাজ্য যখন ক্ষয়িষ্ণু তখন পাশ্চাত্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বিপ্লব চলছিল। এ অবস্থায় ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতনন্মুখ পরিস্থিতি ইউরোপকে বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়। তাদের আধিপত্য বিস্তারের জন্য দু’টি জিনিস প্রয়োজন ছিল। এক- মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা ও ইউরোপের একাংশ নিয়ে গঠিত উসমানীয় সাম্রাজ্যকে ভেঙে টুকরো টুকরো করা। দুই- টুকরো টুকরো ভূখণ্ডে পাশ্চাত্যের স্বার্থ সংরক্ষণকারী পুতুল সরকার বসানো।

ওসমানীয় সামাজ্যের পতন ও মুসলিম বিশ্বের প্রভাব ক্ষুণ্ন করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৮৯৭ সালে থিয়োডর হার্জেল ও তার সহযোগীরা সুইজারল্যান্ডে এক সমাবেশের মাধ্যমে বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। হার্জেল পরবর্তীতে ইহুদিবাদের জনক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বিশ্বে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা তার বড় লক্ষ্য। কোথায় ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হবে, সে ইস্যু সামনে আসলে বিভিন্ন এলাকার নাম উত্থাপিত হয়। হার্জেল ফিলিস্তিনেই ইহুদিদের জন্য প্রথম রাষ্ট্র ও সরকার গঠনের পক্ষে ছিলেন। ওসমানীয় সাম্রাজ্য হার্জেলের এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রাজি না হওয়ায় হার্জেলের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী ও ইহুদিবাদীদের নানা ষড়যন্ত্রের মাঝেই শুরু হয়ে যায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধে নয়া শক্তির সমীকরণের এক পর্যায়ে ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। এরপর বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে। ইহুদিবাদের প্রতি ব্রিটিশ সামাজ্যবাদের সমর্থন ফিলিস্তিনে প্রথম ইহুদিবাদী সরকার গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করে।

১৯১৭ সালে উপনিবেশবাদী ব্রিটেন ও বিশ্ব ইহুদিবাদের মধ্যে সম্পর্কের নয়া অধ্যায় শুরু হয়। ওই বছর তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতির বিষয়ে একটি বিবৃতি প্রকাশ করেন। ১৯১৮ সালে নবপ্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রসংঘ ফিলিস্তিনের ওপর ব্রিটেনের একাধিপত্যকে স্বীকৃতি দেয়। তিন দশক ধরে ব্রিটিশ উপনিবেশ হিসেবে ছিল ফিলিস্তিন। তখন পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার সময় ছিল এটি। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসকরা ফিলিস্তিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সব কাঠামো ধ্বংস করে দিয়েছিল। এই তিন দশকে বিশ্ব ইহুদিবাদ সংস্থা ফিলিস্তিনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ফিলিস্তিনের দিকে ইহুদিদের ঢল নামে। নানা দেশ থেকে তাদেরকে সেখানে নিয়ে আসা হয়। ফিলিস্তিনিদের জমি দখল করে ইহুদিবাদীদের জন্য স্থায়ী আবাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। শক্তি প্রয়োগ করে ফিলিস্তিনিদেরকে ভিটেমাটি ছাড়া করা হয়।

এ সময় ব্রিটিশ সরকারের মদদে ইহুদিবাদীরা গোপনে ‘হাগানা’ নামের সন্ত্রাসী সেনাদল গঠন করে। তারা নিরপরাধ ফিলিস্তিনিদেরকে হত্যার মিশনে নামে। একের পর এক বহু ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। এ অবস্থায় পাশ্চাত্যের পুঁজিপতিরা ইহুদিবাদীদেরকে ব্যাপক অর্থ সাহায্য দেয়। এ অর্থে তারা ফিলিস্তিনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কারখানা ও বিভিন্ন ইহুদিবাদী দপ্তর প্রতিষ্ঠা করে,যাতে সুযোগ এলেই ইহুদিবাদী সরকার প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়া যায়। অবশেষে ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ অন্যায়ভাবে ফিলিস্তিনকে ভাগ করার ইশতেহার প্রকাশ করে। এরই ভিত্তিতে ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করা হয়। এক অংশ দেয়া হয় ইহুদিবাদীদেরকে। সেখানে তারা ইহুদি সরকার প্রতিষ্ঠা করে। অন্য অংশ দেয়া হয় ফিলিস্তিনিদেরকে।

একপেশে ওই ইশতেহারে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের জন্য ফিলিস্তিনের মোট ভূখণ্ডের অর্ধেককে বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু বিশ্বের মোড়লদের ইহুদিবাদপ্রীতির কারণে আজও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেও মোতায়েন রয়েছে ইহুদিবাদী বাহিনী। জাতিসংঘের একপেশে ইশতেহারের পক্ষে ভোট দিয়েছিল ৩৩টি দেশ। এর মধ্যে ছিল আমেরিকা, ব্রিটেন ও অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ। ১৩টি দেশ ইশতেহারের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল। ভোটদানে বিরত ছিল আরও দশটি দেশ। ইশতেহার প্রকাশের এক বছর পর ফিলিস্তিন অংশটিও ইহুদিবাদীরা দখল করে নেয়। এর ফলে সেখানে নেমে আসে হাহাকার। শরণার্থীতে পরিণত করা হয় অসংখ্য ফিলিস্তিনিকে। তার হয়ে পড়েন সহায়-সম্বলহীন।

ফিলিস্তিনি মুসলমানদের এ দুর্দশার মাঝে ইসলামি ও আরব দেশগুলোর মধ্যে অনৈক্য ও বিবাদ ছিল শতাব্দির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। এই সুযোগে অবশেষে ১৯৪৮ মাসের মে মাসে ফিলিস্তিন থেকে ব্রিটিশ বাহিনী চলে যায়। শুরু হয় ইহুদিবাদীদের দুঃশাসন।

১৯৫০’র দশকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গোল্ডা মায়ার বলেছিলেন, “ফিলিস্তিনের বর্তমান প্রজন্মকে নিশ্চিহ্ন করতে হবে। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্ম আর ফিলিস্তিনের কথা মনেই করতে পারবে না।” ফিলিস্তিন ভূখণ্ড ইহুদিদের ভূখণ্ড বলেও তিনি জোর গলায় দাবি করেছিলেন।

তবে ফিলিস্তিনিদের সাহসিকতা ও প্রতিরোধ প্রমাণ করে গোল্ডা মায়ারের মতো ইহুদিবাদীদের স্বপ্ন পূর্ণ হয়নি। কারণ ফিলিস্তিনের নতুন প্রজন্মও মাতৃভূমি উদ্ধারে সোচ্চার রয়েছে এবং প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরাইল নামক অবৈধ রাষ্ট্রের অস্তিত্ব শুধু ফিলিস্তিন নয় গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্যই দুঃখ-দুর্দশার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইসরাইল সৃষ্টির পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তি ও অনিরাপত্তা জেকে বসেছে। ১৯৪৮ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অন্তত ১০টি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। এসব যুদ্ধের মধ্যে ১৯৬৭, ১৯৮২ ও ২০০৬ সালের যুদ্ধের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

ফিলিস্তিন জবরদখলের দুই দশক পর ১৯৬৭ সালে ইহুদিবাদীরা আরব বিশ্বের ওপর ব্যাপকভিত্তিক যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। এ সময় ইহুদিবাদী ইসরাইল জর্দান নদীর পশ্চিম তীর, গাজা উপত্যকা, পূর্ব বায়তুল মোকাদ্দাস, সিরিয়ার গোলান মালভূমি ও মিশরের সিনাই মরুভূমি দখল করে নেয়। আরব ভূখণ্ড দখলের পর এসব এলাকায় ইহুদি উপশহর নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে। জমি দখলের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের অবশিষ্ট বসতিগুলোকে একে অপরের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত করা হয়। এর ফলে ফিলিস্তিনিদের শহর ও গ্রামগুলো পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনিদেরকে বিচ্ছিন্ন করতে ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত এলাকার মাঝখানে ইহুদি উপশহর নির্মাণ করা হয়েছে। ইসরাইল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদেরকে নিয়ে আসার প্রবণতা আরো বেড়ে যায় এবং ফিলিস্তিনিদেরকে তাদের ঘর-বাড়ি থেকে বের করে দিয়ে সেখানে ইহুদি অভিবাসীদেরকে ঢুকিয়ে দেয়া হয়। এর ফলে সব হারিয়ে শরণার্থীতে পরিণত হয় অগণিত ফিলিস্তিনি।

ইসরাইলের এ ধরনের অমানবিক তৎপরতার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ দুটি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের ইশতেহারে ১৯৬৭ সালে দখলীকৃত ভূখণ্ড থেকে সরে আসতে ইসরাইলের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। কিন্তু ইসরাইল ওই দুই ইশতেহারকে কোন গুরুত্বই দেয়নি। এখনও তারা পুরোদমে ইহুদি বসতি নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। এছাড়া ২০০২ সালে ইসরাইল ৭০০ কিলোমিটার দীর্ঘ দেয়াল নির্মাণ করেছে। এ দেয়ালের উচ্চতা ছয় মিটার। এটি বর্ণবাদী দেয়াল নামেও পরিচিত। এই দেয়ালের মাধ্যমেও ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের আরো একটা অংশ নতুনকরে দখলে নিয়েছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কোনো প্রতিবাদকেই গুরুত্ব দিচ্ছে না ইসরাইল। গাজার ওপর ইহুদিবাদীদের ৭ বছরের সর্বাত্মক অবরোধও এখনও অব্যাহত রয়েছে।

অবরোধের পাশাপাশি গাজার ওপর মাঝে মধ্যেই ব্যাপক হামলা চালাচ্ছে ইহুদিবাদীরা। বিশেষকরে ২০০৮ সালে ২২ দিন ও ২০১২ সালে ৮ দিনের ব্যাপক হামলায় গাজাজুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। শাহাদাতবরণ করে বহু নিরপরাধ ফিলিস্তিনি। ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধের মুখে ইহুদিবাদী সেনারা পিছু হটতে বাধ্য হলেও কাপুরুষের মতো ফিলিস্তিনের অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতিসাধন করেছে তারা। পরমাণু অস্ত্র তৈরির মাধ্যমেও গোটা অঞ্চলকে হুমকির মুখে রেখেছে ইসরাইল। দিমুনা গ্রামে ইসরাইলের পরমাণু কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করেছে। অবৈধ রাষ্ট্রটি পরমাণু অস্ত্রবিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে সই করেনি। তারা একের পর এক পরমাণু বোমার মজুদ গড়ে তুলছে। ইসরাইলের কাছে শত শত পরমাণু বোমা রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসরাইলের অপকর্ম এখন গোটা বিশ্বের কাছেই সুস্পষ্ট। পরিস্থিতি এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, প্রথম দিকে যারা ইসরাইল প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছিলেন তারাই এখন এ কথা স্বীকার করছেন- ইসরাইল দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে এবং এটি ভেতর থেকেই ভেঙে পড়বে। যেসব ইহুদি ধোকায় পড়ে অন্য দেশ থেকে ইসরাইলে এসেছিল এখন তারা ইসরাইল ছাড়তে শুরু করেছে। সচেতন নাগরিকরা বলছেন, ইসরাইলি রাজনীতিবিদদের মাঝে নৈতিক অবক্ষয় এবং অর্থনৈতিক দুর্নীতি ইসরাইলের পতনের ঘন্টা বাজিয়ে দিয়েছে।

সম্প্রতি ইসরাইলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ বলেছেন, “ইসরাইল এখন অভ্যন্তরীণভাবে গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে এবং এই সংকট ইসরাইলকে ভেতর থেকেই পতনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।” তিনি বলেছেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, চেকোস্লোভাকিয়া ও ইউগোস্লাভিয়াও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ভঙুর হয়ে পড়েছিল। কারণ ভেতর থেকেই তাদের পচন ধরেছিল।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলে গণঅসন্তোষ বেড়ে গেছে। মাঝে মধ্যেই লাখ লাখ বঞ্চিত মানুষ রাজপথে মিছিলে অংশ নিচ্ছেন। এসব বিক্ষোভকারী বৈষম্য, দারিদ্র, ক্ষুধা, বেকারত্ব, আবাসন সংকট, নৈতিক স্খলন এবং পতিতাবৃত্তির বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছে। এই সেই ইসরাইল যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদেরকে সুখের স্বপ্ন দেখিয়ে আনা হয়েছিল। বলা হয়েছিল তাদের জন্য ভূস্বর্গ বানিয়ে দেয়া হবে। এসব ভুয়া প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরকে ইসরাইলে আনা হলেও এখন উল্টো চিত্রটিই চোখে পড়ছে। সামাজিক বৈষম্যের প্রতিবাদে এরইমধ্যে ১৪ জন বিক্ষোভকারী নিজের শরীরে নিজেই আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। ১৪ জন আত্মহত্যাকারীর প্রথম ব্যক্তি ছিলেন মুশে সালমান। শরীরে আগুন দেয়ার কয়েক দিন পর তিনি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করে। তিনি নিজের শরীরে আগুন দেয়ার আগে এক বার্তায় বলেন, ইসরাইলি নেতারা হলো চোর। তারা মানুষের অর্থ-সম্পদ চুরি করেছে। সাধারণ মানুষের কথা তারা ভাবে না।

ওই আত্মহত্যার ঘটনার পর বিপুল সংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে নামে এবং তারাও মুশে সালমানের কথাগুলোর প্রতি সমর্থন জানায়। এ ধরনের নানা অভ্যন্তরীণ সংকট ইসরাইলি নেতাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। এ ধরনের অভ্যন্তরীণ সংকট থেকে মানুষের দৃষ্টিকে সরাতে তারা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন নতুন যুদ্ধ ও সংকট তৈরির পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে। সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধও সে ধরনের ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ। এছাড়া, ইরানভীতি ছড়িয়ে দিয়ে অভ্যন্তরীণ সঙ্কটকে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছে ইসরাইল। ঘরে-বাইরে কোথাও ভালো নেই ইসরাইল। বিশেষকরে আমেরিকা নিজেই অর্থনৈতিক সমস্যার সম্মুখীন হওয়ায় ইসরাইলের প্রতি দেশটির অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বেড়েছে। সব মিলিয়ে ইসরাইলি নেতারা এখন নিজেরাই তাদের অস্তিত্বের সংকটের বিষয়টি উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। তারা নিজেরাই স্বীকার করছেন যে, ইসরাইল ভেতর থেকেই ভেঙে পড়তে পারে। আর এমনটি হলে গোটা বিশ্বই মুক্তি পাবে বলে সচেতন মহল আশা করছে।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৫

যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্রঃ শান্তির নামে অশান্তির দূত

যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সমগ্র পৃথিবীতে যুদ্ধের আগুন সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ১৪৮ টি যুদ্ধের মধ্যে ১৪১ টি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে।শত হলেও বিশ্বের মোড়ল, তাই কেউই তেমন উচ্চবাচ্য করতে পারেনা।আর মিডিয়ার কাজ হল ঢোলের বাদ্য বাজানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্ব মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব তেমন একটা ছিল না। তাই শুরু করছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ 
৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১ সালের ভোরে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌ-ঘাঁটিতে আক্রমণ পরিচালিত করে জাপান।জাপান পরিচালিত এ বিমান আক্রমণে ১৮৮টি মার্কিন বিমান ধ্বংস হয়। নিহত হয় ২,৪০২ জন এবং আহত বা ঘায়েল হয় ১,২৮২ জন। ফলে মহাযুদ্ধে অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র । এই আক্রমণ ছিল অনেকটা ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগানোর মত। পরবর্তীতে জাপান যার ফলাফল ভোগ করেছে। ৮ই মে ১৯৪৫ সালে জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে আত্নসমর্পণ করে। তখন যুদ্ধ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্ত, ৬ ই আগস্ট এবং ৯ ই আগস্ট যথাক্রমে জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমানবিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ।
আর এই হামলাটি চালানো হয় জার্মানির আত্নসমর্পণের প্রায় তিন মাস পরে।কতটুকু দরকার ছিল এই বোমা হামলার? এই বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক মারা যান।নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২১৪,০০০ জন।জাপানের আসাহি শিমবুন-এর করা হিসাব অনুযায়ী বোমার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগসমূহের ওপর হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য গণনায় ধরে হিরোশিমায় ২৩৭,০০০ এবং নাগাসাকিতে ১৩৫,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে। দুই শহরেই মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ।

উপরের ছবিটি হিরোশিমায় বোমা হামলার পরে তোলা।বড় ভাই ছোট ভাইয়ের লাশ নিয়ে যাচ্ছে কবর দেওয়ার জন্য। 
জাপানের আত্মসমর্পণের পেছনে এই বোমাবর্ষণের ভূমিকা এবং এর প্রতিক্রিয়া ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অধিকাংশের ধারণা এই বোমাবর্ষণের ফলে যুদ্ধ অনেক মাস আগেই সমাপ্ত হয়, যার ফলে পূর্ব-পরিকল্পিত জাপান আক্রমণ (invasion) সংঘটিত হলে উভয় পক্ষের যে বিপুল প্রাণহানি হত, তা আর বাস্তবে ঘটেনি।অন্যদিকে জাপানের সাধারণ জনগণ মনে করে এই বোমাবর্ষণ অপ্রয়োজনীয় ছিল, কেননা জাপানের বেসামরিক নেতৃত্ব যুদ্ধ থামানোর জন্য গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল।
এমন নয় যে পারমানবিক বোমার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানত না।আর এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী মনোভাব ফুটে উঠে।
অবশেষে বিপুল পরিমাণে ক্ষতির মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল। তার মানে এই নয় যে যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ করা শেষ হয়েছে।এমন নয় যে, পারমানবিক বোমার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানত না।তাই এই হামলার কারনে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী মনোভাব ফুটে উঠে। জার্মানির কারনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হলেও যুক্তরাষ্ট্রেরও ধ্বংসলীলা ভোলার নয়।
আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯৪৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হল শীতল যুদ্ধ (Cold War).

শীতল যুদ্ধ (Cold War):
শীতল যুদ্ধ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র সমূহ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার টানাপোড়নের নাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক দেশ।এর পক্ষে থাকে চীন,কিউবা।এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ছিল যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশগুলো। যা ১৯৪৭ সাল থকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। অর্থাৎ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে শেষ হয় শীতল যুদ্ধ। ১৯৯১ সালে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানের মত দেশগুলোর জন্ম হয়।আর এর পেছনে হাত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশে বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনী তৈরীতে সহায়তা করেছিল। বলা হয়ে থাকে আল-কায়দা সহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মার্কিনীদের থেকেই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত । যারা পরবর্তীতে কালসাপে রূপান্তরিত হয়েছে।শীতল যুদ্ধ শেষ হয়েও শেষ হয়নি। এখনও রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পর বিরোধী কাজকর্ম অব্যাহত রয়েছে। মাঝে মাঝেই এই দুই দেশের মধ্যে আটককৃত গুপ্তচর বিনিময় ঘটে।

বলা বাহুল্য যে, যুদ্ধ করা এবং যুদ্ধ লাগানোতে মার্কিনীদের স্বার্থ আছে।অন্যতম কারন হল, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গুলোকে লুটেপুটে খাওয়া যায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য অস্ত্র বাণিজ্য অন্যতম ভূমিকা পালন করে। যদি যুদ্ধ নাই লাগে তাহলে অস্ত্র বিক্রি হবে কি করে? পৃথিবীতে অস্ত্র বাণিজ্যে শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র।যদিও এই নিউজটি কোন সংবাদ মাধ্যমের নয় তবুও লিখলামঃ ইউএন এর এক সামরিক কর্মকর্তার বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিনীদের এই অস্ত্র বাণিজ্যকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে মাফিয়াও নিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারন ও ধরন নিয়ে নির্মিত হয়েছে "Dirty Wars: The World is a battlefield" নামক তথ্যচিত্রটি। লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=O7UCFSbduuY



১৯৭২ সালে ভিয়েতনামে তোলা উপরের ছবিটি মনে করিয়ে দেয় সেদিন পৃথিবী কেঁদেছিল।

 জাপানের আত্ন-সমর্পণের পর থেকে নতুন নতুন কাহিনী যুক্ত হতে থাকে ইতিহাসের পাতায়। যার মধ্যে কোরীয় যুদ্ধ অন্যতম। আর এই যুদ্ধকে শীতল যুদ্ধের (Cold War) অংশ মনে করা হয়। 
কোরীয় যুদ্ধঃ
১৯১০ সাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জাপানী সাম্রাজ্য কোরীয় উপদ্বীপ শাসন করে। আর জাপানের পরাজয়ের পর, মিত্রশক্তিরা কোরীয় উপদ্বীপটিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। মার্কিন প্রশাসন উপদ্বীপটিকে ৩৮তম সমান্তরাল রেখায় ভাগ করে, এর মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী দক্ষিণ অর্ধেক নিজেদের দখলে আনে এবং সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনী উত্তর অর্ধেক অধিকারে আনে।একপাশে মার্কিনীদের সহায়তায় গড়ে উঠে ডানপন্থী সরকার। আর অন্যপাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় গঠিত হয় সাম্যবাদী সরকার। যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক ভাগের সৃষ্টি হয়। ফলে একসময় দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বার বার আলোচনা ভেস্তে যায়। অবশেষে সময়কাল ১৯৫০ সালের ২৫ শে জুন উত্তর কোরিয়া দক্ষিন কোরিয়া আক্রমন করে।রাশিয়া জাতিসংঘের অধিবেশন ত্যাগ করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের কাছ থেকে কোরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের অনুমোদন পাশ করায়। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিন কোরিয়ার হয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ে। যাইহোক, কাজে অথবা অকাজে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করবেই।যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে করেছিল শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য।যার ফলে যুদ্ধ মঞ্চে প্রবেশ করে চীন। রাশিয়া রসদ দিয়ে সাহায্য করে। আর কোরীয় যুদ্ধ মারাত্নক রূপ নেয়। সবদিকে যেন লাশের মিছিল।

এই শিশুগুলো কেন ভুক্তভুগি বলতে পারেন। ওরা যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্রাজ্যবাদী লড়াইয়ের আগুনের শিকার। সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কথা বাদই দিলাম। এই যুদ্ধে হতাহত হয় প্রায় পঁচিশ লক্ষ বেসামরিক মানুষ। এর জবাব কে দেবে?প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সৈন্য নিখোঁজ হয়। তাদের কবর হয়ত উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। 
অবশেষে, প্রায় তিন বছর পর, দুই কোরীয়ার মধ্যে যুদ্ধ বিরিতি সাক্ষর হয়। অনেকটা সংক্ষেপিত ভাবে শেষ করলাম কোরীয় যুদ্ধের ইতিকথা। যুদ্ধ যেন শেষ হয় না। সবাই তো আর মার্কিনীদের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে যুদ্ধে নামতে পারে না। আনেকে তো শোষিত হচ্ছে তো হচ্ছেই। যাই হোক, চলে যাই ভিয়েতনাম যুদ্ধে। ১৯৫৯ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। 

ভিয়েতনাম যুদ্ধঃ 
ভিয়েতনামের সাধারন মানুষের যেন আর মুক্তি নেই। দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ শেষে ভিয়েতনামীরা ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে।এরপর ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম - এই দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়।উত্তর ভিয়েতনামে সাম্যবাদী সরকার গঠিত হয় এবং দক্ষিন ভিয়েতনামে সাম্যবাদ বিরোধীরা ডানপন্থী সরকার গঠন করে।ডানপন্থী সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করে। আর সাম্যবাদীরা চেয়েছিল সমগ্র ভিয়েতনামে একক সাম্যবাদী সরকার গঠন করতে। আবার আম্রিকা। যুক্তরাষ্ট্রের মদদ পুষ্ট দক্ষিন ভিয়েত্নামের সরকার নিপীড়নমূলক আচরণ শুরু করে। আর এই নিপীড়নমূলক আচরণের প্রতিবাদে দক্ষিণ ভিয়েতনামে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করা হয়।১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। মার্কিনীদের জড়িয়ে পরার কারন কী জানেন? মার্কিনীদের "ডমিনো তত্ত্ব" ।ওদের এই তত্ত্বগুলোই সমগ্র বিশ্বে আগুন লাগানোর জন্য যথেষ্ট। এসব বিষয়ে পরে আলোচনা করব। চলে যাই যুদ্ধে।ধরতে গেলে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল, এই ব্যপক সময় নিয়ে চলে ভিয়েতনামের যুদ্ধ। শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে প্যারিসে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে বেশ কিছু বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একটির পর একটি ভেস্তে যায়। একদিকে সামরিক বাহিনী অন্য দিকে সাধারন জনগণ । এই যুদ্ধ যেন থামার নয়।তবুও, ২৩ জানুয়ারি, ১৯৭৩ সালে প্যারিসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু, কিছুদিন পর উভয় পক্ষই চুক্তি ভঙ্গ করে। আবারও, রক্তপাত। ভুক্তভুগী সাধারন মানুষ। তৎকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার আলোচনা চালাতে থাকেন। অবশেষে, ১৩ জুন, ১৯৭৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর ভিয়েতনাম যৌথভাবে প্যারিস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষর করে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সাম্যবাদী শাসনের অধীনে দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হয়। ১৯৭৬ সালে এটি সরকারীভাবে ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নাম ধারণ করে। এই যুদ্ধে প্রায় ৩২ লক্ষ ভিয়েতনামি মারা যান। এর সাথে আরও প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ লাও ও ক্যাম্বোডীয় জাতির লোক মারা যান। মার্কিনীদের প্রায় ৫৮ হাজার সেনা নিহত হন।যুদ্ধ যেন মৃত্যুর দূত হয়ে আসে।

ইরাক যুদ্ধঃ

মানুষের মানবিক গুণাবলী নষ্ট হওয়ার সীমাকে যে অতিক্রম করা যায়, যুক্তরাষ্ট্র তার সাক্ষী।একটি দেশ যে মিথ্যার আশ্রয় কত আয়োজন করে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রমাণ। ২০০৩ সালের ২০শে মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত বাহিনীর ইরাক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।ইরাক আক্রমণ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও কোয়ালিশন বাহিনী যে কারণ দেখিয়েছিল তা হল: ইরাক ১৯৯১ সালের চুক্তি অমান্য করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ করছে এবং তাদের কাছে এ ধরণের অস্ত্রের মজুদও আছে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিল, ইরাক যুক্তরাষ্ট্র, এর জনগণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় ধরণের হুমকি। পরবর্তীতে এএ সমর্থক কর্মকর্তাদের প্রচণ্ড সমালোচনা করা হয়। কারণ আগ্রাসনের পরে পরিদর্শকরা ইরাকে গিয়ে কোন ধরণের গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি। তারা জানায়, ইরাক ১৯৯১ সালেই গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ ত্যাগ করেছে, ইরাকের উপর থেকে আন্তর্জাতিক অনুমোদন সরিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তাদের নতুন করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের কোন পরিকল্পনাও ছিল না।এর দ্বারা যা প্রমানিত হয় তা কার কষ্ট বলার দরকার নেই।
যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্ররা ইরাক আক্রমণ করার পরপরই ইরাকী রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন পালিয়ে বেড়ায়।অবশেষে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তাকে আটক করা হয় এবং ২০০৬ এর ডিসেম্বরে সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এরপর সুন্নি এবং শিয়া দলগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং আল-কায়েদা ইরাকে তাদের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে। এই যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ১৫০,০০০ থেকে ১০ লক্ষের বেশী।মানুষ যেন আর মানুষ থাকে না।

আফগানিস্থান যুদ্ধঃ 
যুদ্ধের আগে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আফগানিস্থানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালই ছিল।যুদ্ধ আফগানিস্থানকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। 
আফগানিস্থান যুদ্ধ শুরু ১৯৭৯ সালে “ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক্‌স” (USSR) এর সামরিক বাহিনী এবং আফগানিস্তানের কম্যুনিস্ট-বিরোধী গেরিলাদের মধ্যে।মুক্তির আন্দোলন হিসেবে যুদ্ধ শুরু হলেও পরবর্তীতে এই যুদ্ধ আফগানিস্থানকে খাদে ফেলে দেয়।যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি করা জঙ্গীরা দেশটিকে যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছে। এখন নাকি মার্কিনীরাই আফগান সরকারকে সহায়তা করছে জঙ্গীদের থেকে বাঁচতে।এ যেন হাস্যকর ব্যাপার। 

বর্তমান সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে না বললেই নয়। আরব বসন্ত শুরু হয়েছে শত মানুষের রক্তপাত ঘটিয়ে। হোসনি মোবারকের পতন, গাদ্দাফীর হত্যাকাণ্ড যার সাথে সিরিয়ার ক্ষুধার্ত শিশুরা চিৎকার করে উঠে। এদিকে জার্মানির বিরোধীদলীয় উপমন্ত্রী সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।
আইএস এর নাম যেন মিডিয়ার সৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ ন্যাটোর ১২ টি দেশ প্রায় এক বছর যাবত যুদ্ধ করছে আইএস এর বিরুদ্ধে। অথচ তারা কিছুই করতে পারছে না। আইএস কি এতই শক্তিশালী?

তাহলে দেখা যাক রাশিয়ার হস্তক্ষেপ।সপ্তাহখানেকে মাঝে আইএসকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছে রুশ বাহিনী। এর মধ্যেই শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের আহাজারি। যুক্তরাষ্ট্রের মুখোশ আর কতভাবে উন্মোচন করতে হবে?

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০১৫

একটি ইরান ও কয়েকটি প্রশ্ন

(১) ইরান শিয়া জাতীয়তাবাদ ছাড়া কিছু বুঝে না।
.
জবাব : ইরান শিয়া জাতীয়তাবাদ ছাড়া কিছু বুঝে কিনা তা জানতে হলে আপনাকে ইরানের সংবিধানে ধর্ম ও মাযহাব সমূহের স্বাধীনতা ও অধিকার সংক্রান্ত ধারাগুলো পড়তে হবে এবং বিপ্লবের পরে সেখানে ধর্মীয় ও মাযহাবী কোনো সমস্যা দেখা দিয়েছে কিনা তা খুঁজে দেখতে হবে। বিপ্লবের আগে বেলুচ ও কুর্দীরা ইরান থেকে স্বাধীনতা চাইতো, কিন্তু এখন কেন চায় না তা জানতে হবে।
ইরান যদি শিয়া জাতীয়তাবাদী হতো তাহলে সুন্নী হামাসকে অকাতরে সাহায্য দিতো না যার সঠিক পরিমাণ কেউ জানে না, তবে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যার বার্ষিক পরিমাণ tens of millions of dollar বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অবশ্য অনেক আরব দেশও, এমনকি পাশ্চাত্য জগতও গাজাবাসীদের জন্য মানবিক ও পুনর্গঠন সাহায্য দিচ্ছে, কিন্তু হামাস ইসরাঈলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে একমাত্র ইরানী অস্ত্র দ্বারা।এছারা সূদান, ইখওয়ান-শাসিত মিসর, আন্-নাহদাহ, তাওহীদে ইসলামী ইত্যাদির সাথে ইরানের সহায়তার নিশ্চয়ই শিয়া জাতীয়তাবাদী হবার প্রমাণ নয়।
.
(২) (ইরান) কয়টা সিরীয়ান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে?!!
.
জবাব : ইরানের সাথে কি সিরিয়ার সরাসরি সীমান্ত আছে? সিরীয় শরণার্থীরা কি ইরানে আশ্রয় নিতে চায়? ইরানে আশ্রয় নিতে গিয়েছে আর ইরান সিরীয় শরণার্থীদেরকে ফিরিয়ে দিয়েছে এমন কোনো তথ্য আপনার কাছে আছে কি?
.
(৩) সউদী যদি হয় আমেরিকার দালাল, ইরান-ও ২ নাস্তিকের দালাল।
.
জবাব : আপনি নিজেই সউদী আরবকে আমেরিকার দালাল বলে উল্লেখ করেছেন। সম্ভবতঃ আপনার জানা আছে যে, সউদী আরবে আমেরিকার সামরিক ঘাঁটি আছে। কিন্তু ইরানে কি কোনো বাইরের দেশের সামরিক ঘাঁটি আছে?
.
ইরান শুধু রাশিয়া ও আসাদের শাসিত সিরিয়ার সাথে মৈত্রী গড়ে তোলে নি, বরং বিপ্লবের পর পরই কিউবা, ভিয়েতনাম, উত্তর কোরিয়া, জিম্বাবে ও এ ধরনের আরো অনেক দেশের সাথে মৈত্রী গড়ে তুলেছে। এর সবগুলোই কৌশলগত মৈত্রী; এখানে দালালীর প্রশ্ন আসে কেন? উল্টো যদি বলতেন যে, তারা ইরানের দালালী করে তাহলে অধিকতর যুক্তিযুক্ত হতো। আপনি জানেন কি নবী করীম (ছাঃ) হুদায়বীয়াহর সন্ধির পরে কয়েকটি মুশরিক গোত্রের সাথে কৌশলগত মৈত্রী চুক্তি করেছিলেন এবং মক্কাহর মুশরিকরা চুক্তি লঙ্ঘন করে এ ধরনের একটি গোত্রের ওপর আক্রমণ করায় তিনি চুক্তি বাতিল ঘোষণা করেন ও এরপর মক্কাহ্ বিজয়ের অভিযান চালান?
.
আসাদ সরকারের সাথে ইরানের মৈত্রীর একমাত্র কারণ হচ্ছে ফিলিস্তিন। কারণ, আসাদের সিরিয়া হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র আরব দেশ যে ফিলিস্তিনীদের সপক্ষে ও ইসরাঈলের বিরুদ্ধে অটলভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে ইরান ও ইসরাঈলের মধ্যে যুদ্ধ হলে ইরানী বাহিনীকে সিরিয়ার মধ্য দিয়েই ফিলিস্তিনে পৌঁছতে হবে। ইসরাঈলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টিকারী হিযবুল্লাহর কাছে ইরানী অস্ত্রও সিরিয়ার মধ্য দিয়েই সেখানে গিয়েছে। আর এ কারণেই আমেরিকা আসাদকে উৎখাত করে সেখানে তার দালালদেরকে ক্ষমতায় বসাতে চাচ্ছে।
.
(৪) চায়নার মুসলিম টর্চার নিয়ে ইরান চুপ কেন?
.
জবাব : একই বিষয়ে সরকার বহির্ভূত জনগণের ও একটি সরকারের প্রতিক্রিয়ার ধরনের মধ্যে যে পার্থক্য থাকে সে সম্পর্কে ধারণা থাকলে আপনি এ প্রশ্ন তুলতেন না। কোনো সরকার চাইলেই একটি দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে কথা বলতে পারে না।
.
সিনকিয়াং-এর মুসলমানদের মধ্যকার একটি দল স্বাধীনতার জন্য অস্ত্র হাতে নিয়েছে বলেই সেখানকার মুসলমানদের ওপরে যুলুম-নির্যাতন চলছে তা-ও দেখতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশই তার দেশের একটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার জন্য তৎপরতা চালাবার অনুমতি দেয় না। তুরস্কের কুর্দীদের হত্যার দিকে তাকান; কোনো মুসলিম দেশ কি কথা বলছে? চীন দাবী করছে যে, সেখানে মুসলিম অসন্তোষের পিছনে আমেরিকার হাত আছে। এখন এ ব্যাপারে ইরান যদি প্রতিবাদ করে তো এটাই প্রমাণ হবে যে, এর পিছনে ইরানের হাত আছে।
.
বিশেষ করে এ ধরনের স্বাধীনতার সাথে ইসলামের কোনোই সম্পর্ক নেই; মুসলমানদের উচিত যেখানেই থাকবে ইসলামের প্রচার-প্রসারের চেষ্টা করবে। সিনকিয়াং না হয় স্বাধীন হলো, চীনের অন্য মুসলমানদের কী হবে? এই বাস্তবতার আলোকে কাশ্মীরের বাইরে ভারতের মুসলমানরা কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবীকে সমর্থন করে না।
.
(৫) (ইরান) পরমাণু চুক্তির পর থেকে ইসরাঈলের বিরুদ্ধে আগের মতো হুমকি দেয় না কেন?
.
জবাব : ইরান তো বহুত আগেই ঘোষণা করেছে যে, সে ইসারঈলের অস্তিত্বকে অবৈধ গণ্য করে এবং ফিলিস্তিন সমস্যার একমাত্র সমাধান ইসরাঈলের বিলুপ্তি বলে মনে করে। বিশ্বের মধ্যে একমাত্র দেশ ইরান যে সরকারীভাবে এ অবস্থান গ্রহণ করেছে। এমনকি পিএলও পর্যন্ত ইসরাঈলের অস্তিত্বকে মেনে নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, হামাসও আপাততঃ ইসরাঈলের বিলুপ্তির দাবী থেকে সরে এসেছে; কেবল গাযাহকে রক্ষা ও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইরান তার অবস্থানে অটল রয়েছে। আপনি কি মনে করেন যে, ইরানকে প্রতিদিনই এটা বলতে হবে? বরং ইসরাঈলই ইরানে হামলা করবে বলে বার বার হুমকি দিয়েছে এবং পারমাণবিক চুক্তি ঠেকানোর জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেছে।
.
ইরান যা করার তা কাজে করছে; হিযবুল্লাহ্ ও হামাসকে অস্ত্র ও অর্থ সাহায্য প্রদান অব্যাহত রেখেছে। এরপরও ইরানী নেতৃবৃন্দ বলেছেন, আগামী বিশ বছর পর ইসরাঈলের অস্তিত্ব থাকবে না 
.
(৬) (ইরান কি) ইরাক যুদ্ধে আমেরিকার দালালী করে নি???
.
জবাব : আপনার কাছে প্রমাণ থাকলে প্রমাণ দিন। বরং প্রথম বার ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় আমেরিকা ইরানকে ডাকা সত্ত্বেও ইরান সাদ্দামের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে যায় নি। কিন্তু সাদ্দাম ছিলেন আমেরিকার দালাল এবং আমেরিকার নির্দেশে কুয়েত দখলের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন।
.
ইরানকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে আমেরিকা তার দালালদের মাধ্যমে ইরাককে যেভাবে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তিতে পরিণত করেছিলো সে লক্ষ্য অর্জন ছাড়াই যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমেরিকা ইসরাঈলের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ, এগারো লক্ষ্য সৈন্য ও দশ লক্ষ স্বেচ্ছাসেবীর বিশাল বাহিনী ও বিশালায়তন অস্ত্রভাণ্ডার (ইরানের শাহের অস্ত্রভাণ্ডার ইসলামী বিপ্লবীদের হাতে পড়ার ন্যায়) কোনোভাবে যদি কোনো মার্কিন-ইসরাঈল বিরোধীর হাতে পড়তো তাহলে ইসরাঈলের অস্তিত্ব থাকতো না। এ কারণেই ইরাকের সামরিক শক্তি ধ্বংস করার লক্ষ্যে কুয়েত দখলের অভিনয় করা হয়। (কুয়েত দখলের আগে সাদ্দাম তা মার্কিন রাষ্ট্রদূত গ্লাসপি-কে বলেছিলেন এবং তিনিও এতে মার্কিন সরকারের অনাপত্তি জানিয়েছিলেন।)
.
একই কারণে, ইরান সাদ্দামকে কুয়েত থেকে চলে আসতে বললে এবং তাঁর বিরুদ্ধে যাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেয়া হয় সে ব্যাপারে মুসলিম বিশ্বের সাথে মিলে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিলেও তিনি তা মানেন নি।
.
কিন্তু আমেরিকা যখন হামলা চালালো তখন বিনাযুদ্ধে সাদ্দাম ইরাকী বাহিনীকে ও তার অস্ত্রভাণ্ডারকে ধ্বংস করার জন্য আমেরিকাকে সুযোগ করে দেন। আর আমেরিকাও, আরেকটি দেশ দখলের কারণে আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধী হওয়া সত্ত্বেও সাদ্দামকে সুযোগ পেয়েও গ্রেফতার করা থেকে বিরত থাকে এবং ইরাকের ক্ষমতায় বহাল রাখে।
.
অন্যদিকে পারস্য উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাযের উপস্থিতি এবং কুয়েত ও সউদী আরবের কাছে বিপুল পরিমাণ মার্কিন অস্ত্র বিক্রির ক্ষেত্র তৈরীর জন্য তিনি কুয়েত ও আমেরিকার বিরুদ্ধে ফাঁকা হুমকি দিতে থাকেন। আর আমেরিকা কেবল তখনি সাদ্দামকে সরিয়ে দেয়ার জন্য চূড়ান্ত অভিযান চালায় যখন তাকে না সরালে ইরাকে শিয়া মাযহাবের অনুসারী জনগণ ও ইরাকের ইসলামী বিপ্লবের সর্বোচ্চ পরিষদ-এর সশস্ত্র গেরিলারা একই সাথে গণ-অভ্যুত্থান ও সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে সাদ্দামকে উৎখাত করবে বলে নিশ্চিত হয়ে যায়।
.
আমেরিকা ধারণা করেছিলো যে, সে এগিয়ে এসে সাদ্দামকে উৎখাত করলে ইরাকের শিয়া ও কুর্দী জনগণ আমেরিকার সমর্থকে পরিণত হয়ে যাবে। কিন্তু ইরাকী দ্বীনী নেতৃবৃন্দ সাদ্দাম ও আমেরিকা কারো পক্ষ না নেয়ায় জনগণও নীরব থাকে এবং সাদ্দামের উৎখাতের পরে তাঁরা আমেরিকার প্রতি ইরাকত্যাগের আহবান জানান।
.
এখানে ইরান কোথায় আমেরিকার দালালী করেছে তার প্রমাণ দিন।
.
(৭) তারা (ইরানীরা) নিজের স্বার্থ ছাড়া মুসলিমদের হেল্প্ করে না।
.
জবাব : আগেই হামাসকে ইরানের সাহায্য করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে; তার পিছনে ইরানের নিজের কী স্বার্থ আছে? সূদানে ইরানের সহযোগিতার পিছনে ইরানের কী স্বার্থ আছে? আর ইরান সাহায্য করতে চাইলেই কি পরপদলেহী তথাকথিত মুসলিম সরকারগুলো তার সাহায্য নেবে?
.
ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের বছর দুই পরের কথা; একটি মুসলিম দেশে ইরানের একজন মন্ত্রীর সফরের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন যে, ইরান ঐ দেশটিকে “ইসলামী শর্তে” তেল দেবে। এই “ইসলামী শর্ত” মানে কী এ নিয়ে বহুত জল্পনা-কল্পনা হয় এবং শেষ পর্যন্ত ইরানী সূত্রে জানা যায় যে, এর মানে হচ্ছে “বিনা মূল্যে”। কিন্তু যে দেশটিকে দেয়া হবে সে দেশটি তা নেয় নি। এছাড়াও ইরান একটি মুসলিম দেশে একটি তেল শোধনাগার নির্মাণ করে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যে দেশে তা করা হবে সে দেশটি আর এ ব্যাপারে অগ্রসর হয় নি। কারণ? কারণ হচ্ছে বিগ্ বস্ আমেরিকার রক্তচক্ষু।
.
(৮) ১৯৮৭-তে হজ্বে (ইরান) কী করেছিলো?
.
জবাব : নিরস্ত্র ইরানী হাজ্বীরা ইসরাঈল ও আমেরিকার বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ইসরাঈল ও আমেরিকাকে খুশী করার উদ্দেশ্যে সউদী সরকার শত শত ইরানী ও অ-ইরানী হাজ্বীকে হত্যা করেছিলো; এমনকি বিক্ষোভ বন্ধ করে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাবার সুযোগও দেয় নি; রাস্তা ও আশেপাশের গলিগুলো বন্ধ করে গুলী চালিয়ে ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে তাঁদেরকে হতাহত করা হয়।
ইরান যে সউদী থেকে “অনেক ভালো” এটা বোধ হয় আপনার কাছে সুস্পস্ট।
Comment

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০১৫

সিরিয়া ও সমকালীন বিশ্ব

সিরিয়ার জিওগ্র্যাফিক্যাল লোকেশান, ঐতিহাসিক পার্সপেক্টিভ, মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতা দখল আর ইনফ্লুয়েন্স ইত্যাদি্র কারনে সিরায়ার ক্ষমতায় কে আছে আর কে থাকবে তার গুরুত্ব অনেক। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে এই মুহূর্তে তিনটি অভ্যন্তরিন দল জড়িত। এক, ক্ষমতাসিন আলাওয়াইট আসাদ এবং তার বাহিনী আর শিয়া মিলিশিয়া বাহিনী। দুই, আসাদকে হটাতে যুদ্ধরত সুন্নি বিদ্রোহী যারা ফ্রি সিরিয়ান আর্মি নামে পরিচিত। তিন, আসাদ এবং ফ্রি সিরিয়ান আর্মি বিরোধী কট্টরপন্থী সুন্নি আইএসআইএস। মেজর যে ৪ টি দেশ এই কনফ্লিক্ট এ জড়িয়ে পড়েছে তারা হোল আমেরিকা, রাশিয়া, ইরান, আর সৌদি আরব। এছাড়াও আরও দুটি দেশ এই যুদ্ধে ভুমিকা রাখছে, তারা হলো তুরস্ক এবং ইসরায়েল।

আমেরিকা
এরা চায় আসাদের পতন। তারা সিরিয়ার আসাদ বিরোধী বিদ্রোহীদের সাপোর্ট করছে এবং এন্টাই আইএসআইএস। আমেরিকার মিলিটারি অল্প সংখ্যক বিদ্রোহীদের ট্রেইনিং দিলেও তা কার্যকরী হয় নি। প্রথমত কাদের ট্রেইনিং দেয়া হবে সেই বাছাই প্রক্রিয়া ছিল অত্যন্ত লম্বা। তারপরেও যাদেরকে ট্রেইনিং দেয়া হয়েছিল তাদের বেশির ভাগই ট্রেইনিং শেষে অস্ত্র নিয়ে হয় দিক পরিবর্তন করেছে না হয় হারিয়ে গেছে। উপরন্তু সিআইএ ৪ থেকে ৫ হাজার বিদ্রোহীকে ট্রেইনিং দিয়েছে, যারা এখনো মাঠে আছে। আর আছে কুর্দিরা, যাদেরকেও আমেরিকা সাপোর্ট দিচ্ছে। আমেরিকা এখন বলছে যে রাশিয়া আইএসআইএস নয় বরং এই ট্রেইন্ড বিদ্রোহীদেরই আগে শেষ করার চেষ্টায় আছে। উপরন্তু এই সংখ্যা আসাদকে হটানোর জন্য মোটেও পর্যাপ্ত না। তাহলে আমেরিকা এখন কি করবে? তারা এখন দুটা কাজ করবে। এক, তাদের পছন্দের গ্রুপকে অস্ত্র আর ইকুইপমেন্ট সাপ্লাই দিবে, যাদের মধ্যে আছে ব্যাটেল হার্টেন্ড কুর্দিরা। আর দিবে এয়ার সাপোর্ট। সাথে চলবে ডিপ্লোমেসি আর প্রচারনা। দুই, তারা রাশিয়াকে হটাতে জোরদার ভাবে মাঠে নামবে না বরং রশিয়ার যুদ্ধ করে দুর্বল হওয়ার অপেক্ষায় থাকবে। আমেরিকা ভাল করেই জানে যে সিরিয়ায় দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ করার মতন অর্থনৈতিক সক্ষমতা রাশিয়ার নেই। তেলের দাম এখন অনেক কমেছে, যা রাশিয়ার অর্থনীতির উপরে প্রভাব ফেলেছে। মেজর তেল সাপ্লায়ার সৌদি আমেরিকার কুক্ষগত টু কন্ট্রোল ওয়েল প্রাইস। তাই তারা যুদ্ধটাকে যে করেই হউক দীর্ঘস্থায়ী করবে। আমেরিকার এখানে লম্বা রেসের ঘোড়া। শেষ খেলাটা এরাই খেলবে।

রাশিয়া 
 মনে রাখা জরুরী এই রাশিয়া আগের সেই সোভিয়েত ইউনিয়ন নয়। অলরেডি ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়া ব্যস্ত, আর মাল্টিপল ফ্রন্ট এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর মতন অর্থনৈতিক সক্ষমতা রাশিয়ার নেই। কিন্তু তারপরেও পুতিন এখানে ঘটা করেই যুদ্ধে জড়াল। কেন? কারন একটাই, মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ান ইনফ্লুয়েন্স। আর ডামাস্কাস হচ্ছে পুতিনের লাস্ট ফ্রন্টিয়ার। আসাদের পতন মানে মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার আর তেমন কোন বন্ধু রাষ্ট্র থাকবে না। আসাদ রেজিম হচ্ছে রাশিয়ার পুরাতন বন্ধু। বন্ধুর চূড়ান্ত বিপদেও যদি রাশিয়া পাশে না থাকে, তাহলে তারা এবার সিরিয়াসলি তাদের ক্রেডিবিলিটি হারাবে। উল্লেখ্য এই যুদ্ধে হেরে গেলে আন্তর্জাতিক বিষয়ে রাশিয়ার কথা বলার ক্ষমতা আর ইনফ্লুয়েন্স অনেক কমে যাবে। ইটস এ হাই স্টেক গ্যাম্বলিং ফর দেম। উল্লেখ্য সিরিয়ার উপকুলবর্তি টারটুসে আছে রাশিয়ার ন্যাভাল বেইস (ছবি), যার দরুন আমেরিকার নেভি এখন পর্যন্ত সিরিয়ার উপকুলে ভিড়তে পারে নি। যদিও রাশিয়া বলছে যে তারা আইএসআই কে ধ্বংস করতে গেছে, বাট মেইক নো মিস্টেক যে তারা আসাদ বিরোধীদেরকেই ধ্বংস করতে গেছে, যাদের মধ্যে আছে আমেরিকা আর সৌদি সাপোর্টেড ফ্রি সিরিয়ান আর্মি বা বিদ্রোহীরা। এই মুহূর্তে তারা আইএসআইএস স্ট্রং হল্ড একটা শহরকে এট্যাক করলে, করছে আসাদ বিরোধীদের স্ট্রং হল্ড দুইটা শহরকে।

সৌদি আরব 
ইরানে সাপোর্টেড আসাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে আছে সৌদি আরব, আঞ্চলিক গেইমের অন্যতম প্রধান পাওয়ার। আর সৌদি সরকার আমেরিকার শক্ত এলাই। এই মুহূর্তে সৌদি ক্রাউন প্রিন্স হচ্ছে আমেরিকার এফবিআই ট্রেইন্ড, যাকে আমেরিকার ডিপ্লোম্যাটিক কমিউনিটিতে ডাকা হয় “প্রিন্স অফ কাউন্টার টেরোরিজম”। আমেরিকান সরকারের খুব কাছের এবং অত্যন্ত পছন্দের লোক। গত দুই বছর সৌদি আরব আমেরিকা থেকে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আর সরঞ্জামাদি কিনেছে। আমেরিকা সৌদি আরবের কাছে এমন অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি আর অস্ত্র বিক্রি করেছে যা এখন পর্যন্ত তারা ইসরায়েলকে পর্যন্ত দেয়নি। সৌদি আরব শিয়া ক্ষমতার ঘোর বিরোধী। আমেরিকার নিষেধ থাকা স্বত্বেও তারা ইয়েমেন এর শিয়া দমনে বম্বিং করতে পিছপা হয় নি। যাতে নিরীহ মানুষ পর্যন্ত মারা গেছে, যা সৌদি সরকারের কাছে কো-লেটারেল ডেমেজ বলেই গন্য। এই সৌদি সরকারও সিরিয়ান বিদ্রোহীদের অস্ত্র সাপ্লাই দিচ্ছে। সৌদি আরব রিসেন্টলি ৫০০ TOW Missile (ইউএস মেইড) বিদ্রোহীদের দিয়েছে, যা বিদ্রোহীদের জন্য এক মারাত্মক অস্ত্র হিসাবে কাজ করবে। এই মিসাইল আসাদ বাহিনীর ট্যাঙ্ক, আর্মারড ক্যারিয়ার, অন্যান্য ভেহিক্যাল ধংসে মুখ্য ভুমিকা রাখেব। সম্প্রতি সৌদি সরকার ঘোষণা দিয়েছে, “ প্রেসিডেন্ট আসাদ ক্ষমতা না ছাড়লে সৌদি আরব নিজেই মিলিটারিলি সিরিয়াকে এট্যক করবে এবং আসাদ ক্ষমতাচ্যুত না হওয়া পর্যন্ত তারা থামবে না।“

ইরান 
এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান খেলোয়াড়, আসাদের ঘোরতর সাপোর্টার, যারা অত্যন্ত ধৈর্য আর বিচক্ষন্তা দিয়ে খেলছে এই পুরা গেইম। ইরানের রেভ্যুলুশানারি গার্ড ফোর্স, গ্রাউন্ড ফোর্স, কুডস ফোর্স আসদের মিলিটারিকে বিভিন্নভাবে ট্রেইনিং করছে। ইরানের ইন্টালিজেন্স এন্ড সিকিউরিটি সার্ভিস আসাদকে পুরাদমে সাহায্য করছে। এমন কি তাদের রেভ্যুলুশানারি গার্ড ফোর্স ইজ অন দ্যা সিরিয়ান গ্রাউন্ড ইন সাম ক্যাপাসিটি। তারাও আসাদকে আর্মস এন্ড এম্যুনিশান সাপ্লাই দিচ্ছে। এছাড়াও ইরান সিরিয়ার প্রো-আসাদ শাবিহা মিলিশিয়াদেরকেও ট্রেইনিং আর সাপোর্ট দিচ্ছে। যদি কোন কারনে আসাদ ক্ষমতাচ্যুত হয় তাহলে তেহরান এদের মাধ্যমে সিরিয়ায় তাদের ইনফ্লুয়েন্স ধরে রাখতে চায়। আসাদকে সাপোর্ট দিচ্ছে লেবানিজ হেজবোল্লাহ সাপোর্টেড আবু-আল ফাদল আল আব্বাস ব্রিগেড আর ইরাকের শিয়া মিলিশিয়ারা, যাদের উপর আছে ইরানের ইনফ্লুয়েন্স। ইরানের আল্টিমেট গোল হল মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ইনফ্লুয়েন্সাল আঞ্চলিক পাওয়ার হওয়া। তার জন্য যা করার দরকার আর যেভাবে খেলার দরকার ইরান সেভাবেই খেলছে।
.
মোট কথা সিরিয়ার মাটিতে রাশিয়ার সাম্প্রতিক যুদ্ধে ওই অঞ্চল আরও আনস্টেবল হয়ে গেলো। প্রতিটি ইনভল্ভড দেশ, বিশেষত আমেরিকা আর রাশিয়া প্রচুর প্রোপাগান্ডা চালাবে। যুদ্ধ ময়দানের অবস্থা অনুযায়ী সবগুলো ইনভল্ভড দেশ তাদের স্ট্র্যাটেজি ক্রমান্বয়ে পরিবর্তন করবে, কিন্তু আল্টিমেট গোল ঠিক রাখবে। আবারও বলছি শেষ খেলা খেলবে আমেরিকা, আর ইরান তার ইনফ্লুয়েন্স যেভাবেই হউক, যে ক্যাপাসিটিতেই হোক ধরে রাখবে।
.
ইন দ্যা মিন টাইম, দিস ইজ গোইং টু বি এ প্রোলংড ওয়ার আর এই যুদ্ধে প্রচুর মানুষ মরবে।