কৈশোরের শুরুতে একবার নানাবাড়ী বেড়াতে যেয়ে বড় মামার ব্যাক্তিগত সংগ্রহশালার অসংখ্য বইয়ের ভীড়ে খুজে পাই ”বলকানের কান্না” নামের সাইমুম সিরীজ এর একটি বই। এই বইতেই প্রথম পড়েছিলাম যে যুগোশ্লাভিয়া নামক দেশটির কয়েকটি অঞ্চল মুসলিম সংখ্যাগরিস্ঠ এবং এই দেশটির আছে সম্বৃদ্ধ ইসলামি ঐতিহ্য।
সোভিয়ত ইউনিয়নের পতনের পর ইউরোপে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। এ সময় যুগোস্লাভিয়াতে মার্শাল জোসেফ টিটোর লৌহকঠিন শাসন ও কম্যুনিষ্ট শাসন এর শোষন আর অত্যাচার এর প্রতিবাদে মাথা তুলল এর প্রদেশ গুলি। যার একটি বসনিয়া-হারজেগোভিনা। কিন্তু সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অন্য প্রদেশগুলির স্বাধীনতা নিয়ে তথাকথিত মানবতাবাদী রাষ্ট্রগুলির বিশেষ মাথাব্যাথা না থাকলেও তাদের সমর্থনে বসনিয়ার স্বাধীনতা কে দমন করতে উঠে পরে লাগল সাবেক যুগোস্লাভিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র সার্বিয়া। কারন ছিল একটাই বসনিয়াতে মুসলিম জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেসময় প্রতিদিন সংবাদ এর একটা বড় অংশ জুড়েই থাকত বসনিয়ার যুদ্ধ। আসলে যার বড় অংশই ছিল মুসলিম দের উপর পরিচালিত গনহত্যার সংবাদ। আর তখনই সমগ্র বিশ্ব পরিচিত হয়ে উঠে একটি নাম এর সাথে। আলিজা ইযত বিগোভিচ। স্বাধীন বসনিয়া-হারজেগোভিনার প্রেসিডেন্ট ও জনমানুষের নেতা। সেই সাথে আধুনিক যুগে ইসলাম বিষয়ে অন্যতম প্রধান গবেষক ও দার্শনিক।
আলিজা ইযতবিগোভিচ এর জন্ম ১৯২৫ সালের ৮ই আগষ্ট উত্তর বসনিয়ার একটি ছোট নগরী বসনিয়াক সামাচ এ। পিতা মুস্তাফা ও মা হীবা ইযতবিগোভিচ। তিনি ছিলেন বসনিয়াক মুসলিম। অর্থাৎ স্থানয় বসনিয় অরিজিন এর মানুষ যারা তুর্কি শাসনামলে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিল। তার দাদার নামও ছিল আলিজা। তিনি একসময় সেই শহরটির মেয়র ছিলেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই নগরিতে থাকা অনেক সার্বিয়ান এর প্রান বাঁচিয়েছিলেন। পিতা মুস্তফা ছিলেন একাউন্টেন্ট। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত হওয়ার কারনে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ১৯২৭ সালে তিনি তার পরিবার এর সাথে বসনিয়ার রাজধানি সারায়েভো তে চলে যান। সেখানে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। বসনিয়া তখন সার্ব সাম্রাজ্য এর অধিনে একটি সায়ত্বশাসিত দেশ। স্কুল জীবনের শেষদিকে শুরু হয় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময় তিনি যোগদেন ”ইয়ং মুসলিম” নামে একটি সংগঠনে। বসনিয়া এ সময় জার্মানির নিয়ন্ত্রনে চলে যায় এবং একটি শায়ত্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে থাকে। সার্ব সাম্রাজ্যের বিরোধী হিসাবে ”ইয়ং মুসলিম” এবং আলিয়া ইযতবিগোভিচ জার্মান নাজি দের সমর্থন করতেন। ১৯৪৪ সালে সার্বিয় জাতিয়তাবাদী বলকান মিলিশীয়াদের হাতে বন্দি হন তিনি। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার দাদার অবদান এর স্বীকৃতি দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তিনি আবার কম্যুনিষ্টদের হাতে বন্দি হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় মার্শাল জোসেফ টিটোর নেতৃত্বে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রদেশগুলিতে কম্যুনিষ্ট শাসন কায়েম হয়। টিটো জোর করে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠার নামে নাস্তিকতার প্রচলন করেন এবং মুসলিমদের উপর অত্যচার শুরু করেন। কম্যুনিষ্ট পার্টির বিরোধিতা করায় আলিজা ইযত বিগোভিচ কে তিন বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন এবং কর্মজীবন শুরু করেন। কঠোর কম্যুনিষ্ট শাসন এর মধ্যেও তিনি ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করতেন। বসনীয় হিসেবে তিনি সার্বিয় প্রধান তথাকথিত যুগোস্লাভিয়ার সরকার এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদে অংশ নিতেন। ১৯৭০ সালে তিনি লিখেন তার অন্যতম বিখ্যাত বই ”ইসলামিক ডিক্লারেশন”। বইটি প্রকাশিত হলে ইউরোপ এবং বিশ্বে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন। বইটিতে তিনি ইসলামি ও আধুনিক রাষ্ট্র বিষয়ে বিষয়ে নতুন ধারনা উপস্থাপন করেন এবং এটি প্রমান করেন যে আধুনিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্র কোন অসম্ভব বিষয় নয়। ১৯৮৩ সালে এই বইটি লিখার জন্য কম্যুনিষ্ট আদালত তাকে চোদ্দ বছর এর কারাদন্ড দেয়। পাঁচবছর কারাগারে কাটিয়ে ১৯৮৮ সালে কম্যুনিষ্ট পার্টির পতন এর পর মুক্তি পান।
মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তার সমমনা দের নিয়ে গঠন করেন পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক একশন। বসনিয় ভাষায় যার সংক্ষিপ্ত নাম এসডিএ। এসডিএ ছিল প্রধানত মুসলিমদের নিয়ে গঠিত দল। ১৯৯০ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রদেশগুলিতে প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে এসডিএ ৪৪ শতাংশ সমর্থন লাভ করে। সেসময় এর নিয়ম অনুসারে বসনিয়াতে ছিল সাত সদস্য এর একটি প্রেসিডেন্সি। যার দুইজন বসনিয় মুসলিম হতেন। আলিজা প্রেসিডেন্সির সদস্য হন এবং ঐক্যমতের ভিত্তিতে বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯২ সালে পুর্নাঙ্গ স্বাধীনতার প্রশ্নে গনভোট এর আয়োজন করা হয় এবং বসনিয় মুসলিম এবং ক্রোট দের বিপুল ভোটে বসনিয়া স্বাধিন রাষ্ট্র হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে।
কিন্তু ইউরোপের বুকে একটি স্বাধীন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্রের অস্তীত্ব মেনে নিতে প্রস্তত ছিলনা তথাকথিত সভ্য পাশ্চাত্য। বসনিয়া স্বাধীনতার তীব্র বিরোধী ছিল বসনিয়ায় বসবাসকারি সার্বিয় বংশোদ্ভুত জনগোষ্ঠী। বসনিয়ার স্বাধীনতাকে মেনে না নিয়ে তারা সার্বিয়ার নিয়মিত সশস্ত্রবাহীনির সহায়তায় জোর করে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে খৃষ্টান ক্রোট রাও মুসলিম বসনিয়াক দের সাথে বসবাস করতে বিশেষ উৎসাহী ছিলনা। তারাও এই সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেয়। সামরিক শক্তি বিহীন বসনিয়া পড়ে যায় মহাবিপদে। তথাকথিত আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এই সময় মানবতা বা শান্তির নামে উল্টো বসনিয়ার উপরই আরোপ করে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। এই অবস্থায় সার্ব খৃষ্টানরা বসনীয়ার বিরাট অংশ দখল করে এবং চালায় একাধিক গনহত্যা ও ধর্ষন। সার্বিয়ানরা খোলাখুলি ভাবেই স্বীকার করত যে তাদের হামলার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এথনিক ক্লিনীং তথা বসনিয়ার মুসলিমদের পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়া। এই ভয়ংকর সময়ে দেশকে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিয়ে বসনিয়া ও সারা বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে উঠেন আলিজা ইযতবিগোভিচ।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলার পর ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটনে একটি শান্তীচুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুযায়ি বসনিয়ার সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্ট পদে তিন জাতির তিনজন প্রতিনিধি রাখার নিয়ম করা হয়। নতুন নির্বাচনে ও তিনি জয়লাভ করে রাষ্ট্রপতি হন। ২০০০ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বপালন করে স্বাস্থ্যগত কারনে তিনি অবসর নেন। বসনিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠী যারা মূলত বসনিয়ার ভুমিপুত্র তাদের জন্য তার বিশেষ অবদান এর স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বসনিয়ায় ”দিদো” তথা দাদা নামে পরিচিত । ১৯৪৯ সালে হালিদা রিপুভিচ এর সাথে বিয়ে হয় তার। তাদের এক পুত্র বাকির ইযতবিগোভিচ বর্তমানে বসনিয়া প্রেসিডেন্সীর সদস্য। ২০০৩ সালের ১৯ এ অক্টোবর তিনি হৃদরোগে ইন্তেকাল করেন। বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে তাকে দাফন করা হয়।
পশ্চিমা রাষ্ট্র ও মিডিয়া গুলি তাকে তাদের অন্যতম শত্রু বলেই বিবেচনা করত। কারন তিনি কেবল ইউরোপের বুকে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের নেতাই ছিলেন না। ছিলেন একজন উচ্চস্তরের ইসলামি চিন্তাবীদ ও দার্শনিক। তার ”ইসলামিক ডিক্লারেশন” এবং ”ইসলাম বিটুইন ইষ্ট এন্ড ওয়েষ্ট” গ্রন্থদুটির জন্য তিনি বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। ”ইসলাম বিটুইন ইষ্ট এন্ড ওয়েষ্ট” বইতে তিনি অত্যন্ত যুক্তির সাথে এটা প্রমান করেন যে ইসলাম পাশ্চাত্য দৃষ্টিতে প্রচলিত ধর্মের মত কোন ধর্ম নয় বরং একটি পুর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম বর্তমান আধুনিক বিশ্বের উপযোগি নয় বলে যে মিথ্যা পাশ্চাত্য মিডিয়া প্রচার করে থাকে তার যুক্তিপূর্ন জবাব দিয়েছিলেন এই বইতে তিনি। তার এই যুক্তিপুর্ন মতামত এর জন্য অনেক পাশ্চাত্যপন্থীর কাছে তিনি এখনও মৌলবাদী নেতা!
আজ ১৯ এ অক্টোবর তার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তার রুহ এর মাগফিরাত কামনা করছি।
সোভিয়ত ইউনিয়নের পতনের পর ইউরোপে জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ ঘটে। এ সময় যুগোস্লাভিয়াতে মার্শাল জোসেফ টিটোর লৌহকঠিন শাসন ও কম্যুনিষ্ট শাসন এর শোষন আর অত্যাচার এর প্রতিবাদে মাথা তুলল এর প্রদেশ গুলি। যার একটি বসনিয়া-হারজেগোভিনা। কিন্তু সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অন্য প্রদেশগুলির স্বাধীনতা নিয়ে তথাকথিত মানবতাবাদী রাষ্ট্রগুলির বিশেষ মাথাব্যাথা না থাকলেও তাদের সমর্থনে বসনিয়ার স্বাধীনতা কে দমন করতে উঠে পরে লাগল সাবেক যুগোস্লাভিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র সার্বিয়া। কারন ছিল একটাই বসনিয়াতে মুসলিম জাতি সংখ্যাগরিষ্ঠ। সেসময় প্রতিদিন সংবাদ এর একটা বড় অংশ জুড়েই থাকত বসনিয়ার যুদ্ধ। আসলে যার বড় অংশই ছিল মুসলিম দের উপর পরিচালিত গনহত্যার সংবাদ। আর তখনই সমগ্র বিশ্ব পরিচিত হয়ে উঠে একটি নাম এর সাথে। আলিজা ইযত বিগোভিচ। স্বাধীন বসনিয়া-হারজেগোভিনার প্রেসিডেন্ট ও জনমানুষের নেতা। সেই সাথে আধুনিক যুগে ইসলাম বিষয়ে অন্যতম প্রধান গবেষক ও দার্শনিক।
আলিজা ইযতবিগোভিচ এর জন্ম ১৯২৫ সালের ৮ই আগষ্ট উত্তর বসনিয়ার একটি ছোট নগরী বসনিয়াক সামাচ এ। পিতা মুস্তাফা ও মা হীবা ইযতবিগোভিচ। তিনি ছিলেন বসনিয়াক মুসলিম। অর্থাৎ স্থানয় বসনিয় অরিজিন এর মানুষ যারা তুর্কি শাসনামলে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছিল। তার দাদার নামও ছিল আলিজা। তিনি একসময় সেই শহরটির মেয়র ছিলেন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সেই নগরিতে থাকা অনেক সার্বিয়ান এর প্রান বাঁচিয়েছিলেন। পিতা মুস্তফা ছিলেন একাউন্টেন্ট। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত হওয়ার কারনে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ১৯২৭ সালে তিনি তার পরিবার এর সাথে বসনিয়ার রাজধানি সারায়েভো তে চলে যান। সেখানে তিনি শিক্ষা লাভ করেন। বসনিয়া তখন সার্ব সাম্রাজ্য এর অধিনে একটি সায়ত্বশাসিত দেশ। স্কুল জীবনের শেষদিকে শুরু হয় হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। এই সময় তিনি যোগদেন ”ইয়ং মুসলিম” নামে একটি সংগঠনে। বসনিয়া এ সময় জার্মানির নিয়ন্ত্রনে চলে যায় এবং একটি শায়ত্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে থাকে। সার্ব সাম্রাজ্যের বিরোধী হিসাবে ”ইয়ং মুসলিম” এবং আলিয়া ইযতবিগোভিচ জার্মান নাজি দের সমর্থন করতেন। ১৯৪৪ সালে সার্বিয় জাতিয়তাবাদী বলকান মিলিশীয়াদের হাতে বন্দি হন তিনি। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তার দাদার অবদান এর স্বীকৃতি দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এর কিছুদিন পরেই তিনি আবার কম্যুনিষ্টদের হাতে বন্দি হন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় মার্শাল জোসেফ টিটোর নেতৃত্বে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রদেশগুলিতে কম্যুনিষ্ট শাসন কায়েম হয়। টিটো জোর করে কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠার নামে নাস্তিকতার প্রচলন করেন এবং মুসলিমদের উপর অত্যচার শুরু করেন। কম্যুনিষ্ট পার্টির বিরোধিতা করায় আলিজা ইযত বিগোভিচ কে তিন বছর কারাদন্ড দেওয়া হয়। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি সারায়েভো বিশ্ববিদ্যালয় হতে আইন বিষয়ে ডিগ্রি লাভ করেন এবং কর্মজীবন শুরু করেন। কঠোর কম্যুনিষ্ট শাসন এর মধ্যেও তিনি ইসলাম সম্পর্কে পড়াশুনা করতেন। বসনীয় হিসেবে তিনি সার্বিয় প্রধান তথাকথিত যুগোস্লাভিয়ার সরকার এর বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদে অংশ নিতেন। ১৯৭০ সালে তিনি লিখেন তার অন্যতম বিখ্যাত বই ”ইসলামিক ডিক্লারেশন”। বইটি প্রকাশিত হলে ইউরোপ এবং বিশ্বে তিনি পরিচিত হয়ে উঠেন। বইটিতে তিনি ইসলামি ও আধুনিক রাষ্ট্র বিষয়ে বিষয়ে নতুন ধারনা উপস্থাপন করেন এবং এটি প্রমান করেন যে আধুনিক যুগে ইসলামি রাষ্ট্র কোন অসম্ভব বিষয় নয়। ১৯৮৩ সালে এই বইটি লিখার জন্য কম্যুনিষ্ট আদালত তাকে চোদ্দ বছর এর কারাদন্ড দেয়। পাঁচবছর কারাগারে কাটিয়ে ১৯৮৮ সালে কম্যুনিষ্ট পার্টির পতন এর পর মুক্তি পান।
মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তার সমমনা দের নিয়ে গঠন করেন পার্টি অফ ডেমোক্রেটিক একশন। বসনিয় ভাষায় যার সংক্ষিপ্ত নাম এসডিএ। এসডিএ ছিল প্রধানত মুসলিমদের নিয়ে গঠিত দল। ১৯৯০ সালে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার প্রদেশগুলিতে প্রথম বহুদলীয় নির্বাচনে এসডিএ ৪৪ শতাংশ সমর্থন লাভ করে। সেসময় এর নিয়ম অনুসারে বসনিয়াতে ছিল সাত সদস্য এর একটি প্রেসিডেন্সি। যার দুইজন বসনিয় মুসলিম হতেন। আলিজা প্রেসিডেন্সির সদস্য হন এবং ঐক্যমতের ভিত্তিতে বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট হন। ১৯৯২ সালে পুর্নাঙ্গ স্বাধীনতার প্রশ্নে গনভোট এর আয়োজন করা হয় এবং বসনিয় মুসলিম এবং ক্রোট দের বিপুল ভোটে বসনিয়া স্বাধিন রাষ্ট্র হিসেবে আত্ম প্রকাশ করে।
কিন্তু ইউরোপের বুকে একটি স্বাধীন মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ট রাষ্ট্রের অস্তীত্ব মেনে নিতে প্রস্তত ছিলনা তথাকথিত সভ্য পাশ্চাত্য। বসনিয়া স্বাধীনতার তীব্র বিরোধী ছিল বসনিয়ায় বসবাসকারি সার্বিয় বংশোদ্ভুত জনগোষ্ঠী। বসনিয়ার স্বাধীনতাকে মেনে না নিয়ে তারা সার্বিয়ার নিয়মিত সশস্ত্রবাহীনির সহায়তায় জোর করে ক্ষমতা দখল করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে খৃষ্টান ক্রোট রাও মুসলিম বসনিয়াক দের সাথে বসবাস করতে বিশেষ উৎসাহী ছিলনা। তারাও এই সশস্ত্র যুদ্ধে যোগ দেয়। সামরিক শক্তি বিহীন বসনিয়া পড়ে যায় মহাবিপদে। তথাকথিত আন্তর্জাতিক গোষ্ঠী এই সময় মানবতা বা শান্তির নামে উল্টো বসনিয়ার উপরই আরোপ করে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। এই অবস্থায় সার্ব খৃষ্টানরা বসনীয়ার বিরাট অংশ দখল করে এবং চালায় একাধিক গনহত্যা ও ধর্ষন। সার্বিয়ানরা খোলাখুলি ভাবেই স্বীকার করত যে তাদের হামলার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে এথনিক ক্লিনীং তথা বসনিয়ার মুসলিমদের পৃথিবী থেকেই সরিয়ে দেওয়া। এই ভয়ংকর সময়ে দেশকে দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব দিয়ে বসনিয়া ও সারা বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে উঠেন আলিজা ইযতবিগোভিচ।
১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলার পর ১৯৯৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেটনে একটি শান্তীচুক্তি হয়। এই চুক্তি অনুযায়ি বসনিয়ার সর্বোচ্চ প্রেসিডেন্ট পদে তিন জাতির তিনজন প্রতিনিধি রাখার নিয়ম করা হয়। নতুন নির্বাচনে ও তিনি জয়লাভ করে রাষ্ট্রপতি হন। ২০০০ সাল পর্যন্ত এই দায়িত্বপালন করে স্বাস্থ্যগত কারনে তিনি অবসর নেন। বসনিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠী যারা মূলত বসনিয়ার ভুমিপুত্র তাদের জন্য তার বিশেষ অবদান এর স্বীকৃতি হিসেবে তিনি বসনিয়ায় ”দিদো” তথা দাদা নামে পরিচিত । ১৯৪৯ সালে হালিদা রিপুভিচ এর সাথে বিয়ে হয় তার। তাদের এক পুত্র বাকির ইযতবিগোভিচ বর্তমানে বসনিয়া প্রেসিডেন্সীর সদস্য। ২০০৩ সালের ১৯ এ অক্টোবর তিনি হৃদরোগে ইন্তেকাল করেন। বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে তাকে দাফন করা হয়।
পশ্চিমা রাষ্ট্র ও মিডিয়া গুলি তাকে তাদের অন্যতম শত্রু বলেই বিবেচনা করত। কারন তিনি কেবল ইউরোপের বুকে একটি মুসলিম রাষ্ট্রের নেতাই ছিলেন না। ছিলেন একজন উচ্চস্তরের ইসলামি চিন্তাবীদ ও দার্শনিক। তার ”ইসলামিক ডিক্লারেশন” এবং ”ইসলাম বিটুইন ইষ্ট এন্ড ওয়েষ্ট” গ্রন্থদুটির জন্য তিনি বিশেষভাবে খ্যাত ছিলেন। ”ইসলাম বিটুইন ইষ্ট এন্ড ওয়েষ্ট” বইতে তিনি অত্যন্ত যুক্তির সাথে এটা প্রমান করেন যে ইসলাম পাশ্চাত্য দৃষ্টিতে প্রচলিত ধর্মের মত কোন ধর্ম নয় বরং একটি পুর্নাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। ইসলাম বর্তমান আধুনিক বিশ্বের উপযোগি নয় বলে যে মিথ্যা পাশ্চাত্য মিডিয়া প্রচার করে থাকে তার যুক্তিপূর্ন জবাব দিয়েছিলেন এই বইতে তিনি। তার এই যুক্তিপুর্ন মতামত এর জন্য অনেক পাশ্চাত্যপন্থীর কাছে তিনি এখনও মৌলবাদী নেতা!
আজ ১৯ এ অক্টোবর তার ১২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তার রুহ এর মাগফিরাত কামনা করছি।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন