রাজা মহারাজাদের বাইরে উনিশ শতকে প্রাচ্য জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত বিদ্বান ব্যক্তির নাম জামালুদ্দিন আফগান। তাঁর জন্ম ইরানে না আফগানিস্তানে, তিনি শিয়া না সুন্নী, তিনি তুর্কীর সুলতান না রাশিয়ার জারের চর-এই জাতীয় তর্ক তুলেছেন বিশ শতকের ইহুদী ও খৃষ্টান পণ্ডিতরা। তারা আফগানিকে দাঙ্গাবাজ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। রেজা শাহর ইরানেও কিছু পণ্ডিত তাঁর ইরানে জন্মের দাবি পেশ করেন। তাঁর জন্ম সন কেউ বলেন ১৮৩৮ কেউ ১৮৩৯। কিন্তু তিনি ইন্তেকাল করেছেন বিখ্যাত অবস্থায় ১৮৯৭ সালে। তারিখটা ৯ই মার্চ। তখন তিনি তুর্কী সুলতানের নজরবন্দী। সন্দেহ করা হয় তাঁর মৃত্যুর পেছনে সুলতানের হাত ছিল।
ঊনিশ শতকে ইউরোপীয় সাংবাদিকরা জামালুদ্দিনকে প্যান ইসলাম মতবাদের প্রবক্তারূপে পরিচিত করার চেষ্টা করতেন। এটাও ওরিয়েন্টালিস্টদের তৈরী করা গল্প। আজকাল যেরকম মৌলবাদ বলে একটা পশ্চিমা বোমা আমাদের সাংবাদিকরা বিনা বিচারে প্রতিদিন ফাটান প্যান ইসলামও তেমনই এক অপরক্ষীতি বোমার অধিক নয়। কিছুদিন আগেও দুনিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোকে তৃতীয় বিশ্ব বলে পরিচয় দেয়ার এক রেওয়াজ ছিল। উনিশ শতকের তৃতীয় বিশ্ব বলা যেতো দুনিয়ার সকল উপনিবেশ ও অর্ধ-উপনিবেশ। জামালুদ্দিন আফগানি এই দুনিয়ার মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের শত্র“রা তাঁকে প্যান ইসলামিজম মতবাদের উকিল পরিচয় দিয়ে কিছু এক ঘরে করার কৌশল করেছেন। জামালুদ্দিন অনুরক্ত কবি ইকবাল যখন লেখেন সারা জাঁহা হামারা, তাতে এই শিক্ষকেরই কথা কবিতা রূপ পায় মাত্র। জামালুদ্দিন মানব বিশ্ব মানতেন।
অথচ জামালুদ্দিন যখন পরাধীন বৃটিশ ভারতে এসেছিলেন তখন তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু মুসলমান সকল ভারতবাসীর এক কাতার কামনা করেন। বিপিনচন্দ্র পাল প্রভৃতি হিন্দু নেতা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন কিন্তু বৃটিশ সরকার তাঁকে আলবার্ট হলে বক্তৃতা দিতে দেয়নি। বাংলায় পন্ডিত রেয়াজ অলদীন অল মহহাদী ‘সমাজ ও সংস্কার’ নাম দিয়ে ১৮৮০’র দশকে জীবনী বই লিখেছিলেন। বৃটিশ গভর্নমেন্ট সে বই বাজেয়াপ্ত করে তারা জামালকে কলিকাতা ছাড়া করে।
জামালের দেয়া গল্প অনুসারে তিনি ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রকাশ সিপাহী বিদ্রোহের যুগে ‘হিন্দুস্থানের মাদ্রাসায় পড়ালেখা করতে এসেছিলেন। ১৮৮৬-৬৮ সালে তিনি আফগানিস্তানের আমীর আজম খাঁর উপদেষ্টা হন। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী তাঁর কাজকর্মের তখনই প্রকাশ্য সূত্রপাত। এরপর তিনি ইস্তাম্বলের নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ‘দারুল ফুনুন’ এ সম্মানিত অধ্যাপক মনোনীত হয়। সেখান থেকে তিনি মিশরে যান। ১৮৭১-৭৯ মিশরে অলি আজহারের বাইরে স্বাধীন শিক্ষক হিসেবে সে দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীদের তিনি পড়াতেন। এই ছাত্রদের মধ্যে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ পরে মিশরের জাতীয় মুফতি হন। ইংরেজরা মিশর দখল করে ১৯৮২ তে, জামালুদ্দিনকে তার অনেক আগেই সে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। দক্ষিণ ভারতের হায়দারাবাদে তার পরের আশ্রয় লাভ ঘটে। বৃটিশের ধামাধরা আলিগড় খ্যাত সৈয়দ আহমদ খানের বিরুদ্ধে তিনি “প্রকৃতিবাদের মোকাবেলা” নামে এক বই লেখেন। এই বই ইংরেজীতে “Refutation of the Materialist” নামে পরিচিত। এটি একটু উদ্দেশ্য প্রণোদিত অনুবাদ। জামালের মূল ফার্সিতে ব্যবহৃত শব্দটি “নেচারিয়া” বা “নেচার পন্থী”।
বৃটিশ গভর্নমেন্ট জামালকে প্রথমে অন্তরীণ ও পরে বহিষ্কার করেন। এরপর জামাল লন্ডন হয়ে প্যারিস যান। প্যারিস থেকে ইন্দু-ফরাশি সাম্রাজ্যের বিরোধের সুযোগ নিয়ে তিনি এক স্বাধীনতাপন্থী পত্রিকা বার করেন আরবী ভাষায়। এর নাম আল আরবা আল বুসকা বা “নাড়ির বাঁধন”। এই পত্রিকা ডাকযোগে যেখানেই পৌঁছতো সেখানেই স্বাধীনতার কর্মী তৈরী করতো। বৃটিশরা এই পত্রিকা দমনের চেষ্টা করেন। দু বছরের মধ্যে কাগজ বন্ধ হয়ে যায়। সুদানের মাহাজি, তুরস্কের সুলতান, ইরানের শাহ, রাশিয়ার জারের সাথে কাজ করবার সেরে তিনি ১৮৯১-৯২ সালে ইরানের প্রথম গণ আন্দোলনে শরীক হন। নাসিসুদ্দিন শাহ ইরানের কাজার বাদশা তাকে বের করে দেন। পরের কালে ইমাম আয়াতোল্লাহ খোমেনীর আমলে যা হয়েছে আফগানির অনুপ্রেরণায় ইংরেজ তামাক কোম্পানীর বিরুদ্ধে সার্বিক গতিরোধ ও বর্জন আন্দোলনে তার প্রথম পোশাক সহ মহড়া হয় বলে অনেকে মনে করেন।
১৮৯১-৯২ সালে নস হয়ে আফগানি আবার তুরস্কে আসেন। আফগানির ধ্যান ধারনার মধ্যে গণমুখীনতা স্পষ্ট অথচ তাকে রাজা বাদশাহরা কিছুদিন পাত্তা দিয়েছেন। যখন বাদশাহ নামাদার-আব্দুল হামিদ-দেখলেন তার শাহী কল্পনা অনুসারে আফগানি চলছেন না, তখনই তাকে আটক করা হয়। ১৮৯২ থেকে মৃত্যুর মুহুর্ত পর্যন্ত আফগানি ইস্তাম্বুলের কাছে বাদশাহর দেয়া এক বাড়িতে অন্তরীণ ছিলেন।
আফগানি পরাধীন ও অর্ধ পরাধীন প্রাচ্যের মুক্তি সৈনিক। এটাই তার বড় পরিচয় কিন্তু বিংশ শতাব্দীর রাজনীতি ও সাহিত্যে ইউরোপীয় প্রধানরা ওঁকে কেবল ধর্মীয় নেতা হিসেবে ছোট করার হেন প্রয়াস নাই করেন নি। ভারতেও তিনি কিছু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে কোনঠাসা জামালুদ্দিন কতটা দূরদর্শী নেতা ছিলেন তা বুঝবেন যখন তিনি কলিকাতায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে কিভাবে ভারতীয় ঐতিহ্যের গুনগান করছেন দেখবেন। স্মর্তব্য, এই সময় তার সমবয়সী শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় “আনন্দমঠ” লিখে ফেলেছেন। কিছুদিন আগে পূণঃপ্রকাশিত (আমার দেশ আমার শতেক বইয়ে) নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মূল্যায়ন জানা গেল। ভারতের মুসলমান জাগরণের আসল হোতার সম্মান তিনিও দিয়েছেন আফগানিকে।
আফগানির তাৎপর্য বোঝার দুইটা পদ্ধতি আছে। সৈয়দ আহমদ খান ইংরেজের কদমবুচি পছন্দ করতেন, আফগানি সেই কারণেই সৈয়দের সমালোচনায় অকৃপণ, অক্লান্ত ছিলেন আমাদের কালে মার্তিনিকের কালো মনীষী হযরত ফ্রানস ফানো এবং আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের আল্লামা ম্যালকম একস যে রকম যোদ্ধা আফগানিকে আমার সে রকম সাহসী মানুষ মনে হয়। আফগানি লেখাপড়া যতটা জানতেন ততটা লিখে যাননি। এটাই আমাদের পোড়া কপাল। তবু তৎকালে ইউরোপের মনীষীকুলশ্রেষ্ঠ বলে খ্যাত মৌলানা এর্নেস্ত রেনেসার সাথে তর্কে তিনি যে দীপ্ত ও সভ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তা আজকের বর্ণবাদ বিরোধী সকল গণতন্ত্রের ফৌজকে সাহস দেয়।
পশ্চিমা ইহুদী ও খৃষ্টান পণ্ডিতরা জামালুদ্দিনকে চোট করার যে সব চেষ্টা করেছেন তার পেছনেও এই সত্য পুনঃপ্রমাণিত হয়। জামাল আপোষ করেন নি। না স্বৈরাচারী রাজা বাদশাহর সাথে। না বিদেশী ডাকাত চোর সওদাগর শাসকদের সাথে। জামালুদ্দিন সারা দুনিয়ার মজদুর বুর্জোয়া নির্বিশেষে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রানপুরুষ।
জামালুদ্দিন আফগানি বড় মানুষ তার জীবন বড় কিন্তু সকল বড় মানুষের মত মৃত্যুর পর তিনিও বড় হয়েছেন আরো। মাত্র ৫৮/৫৯ বছর বেঁচেছিলেন এই মহান শিক্ষক। সংসার করেন নি, সম্পত্তির পেছনে মাথা কোটেননি। তার একমাত্র স্বপ্ন ছিল পরাধীন দেশের মুক্তি-যার বিহনে মনুষ্য কখনোই চিত্তের সম্যক স্ফুর্তি করতে পারে না।