মঙ্গলবার, ১৮ এপ্রিল, ২০১৭

পহেলা বৈশাখ, একটি বাস্তববাদী "ময়না তদন্ত"

গত কয়েকদিন ধরে পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। কেউ বা পক্ষে কেউ আবার বিপক্ষে। তবে আসলেই যদি আমরা জানতে চাই এ সম্পর্কে, তাহলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে দেখতে হবে, অন্তত কয়েক হাজার বছর। লেখাটা ব্লগ পোস্টের হিসেবে একটু বড় তবে বিষয়ের বিচারে বেশ ছোট। ধৈর্য থাকলে পড়তে পারেন।

সংস্কৃতি

সংস্কৃতি কি এটা নিয়ে অনেক আলোচনা সম্ভব। তবে সাধারন ভাবে যা নিয়ে আমাদের জীবন, পরিবার ও সমাজ তথা আমাদের সামগ্রিক জীবন গঠিত তাই সংস্কৃতি। অর্থাৎ, আমরা যা খাই যেভাবে খাই, যা পড়ি, যেভাবে থাকি, যেভাবে কথা বলি এগুলার সমন্বিত রুপ হল সংস্কৃতি। David Crystal বলেন,
‘Culture is the way of life of a group of people consisting of learned patterns of behavior and thought passed on from one generation to next’ (Encyclopedia : David Crystal)
সংস্কৃতি হতে পারে দুই ধরনের
১ স্থানীয়।
২ ধর্মীয়।
প্রাচীন বাংলা
হাজার বছর আগে আমাদের পূর্ব পুরুষগন কেমন ছিলেন। তাদের জীবন কেমন ছিল? তারা কিভাবে জীবন যাপন করতেন?  ‘বাংলাদেশের ইতিহাস ৮ম শতক থেকে চিহ্নত করা যায়।এর পূর্বের ইতিহাস আছে কিন্তু সুস্পষ্ট নয়’।তবে এ ব্যাপারে মোটামুটি সবাই একমত প্রাচীন বাংলার মানুষেরা ছিলেন প্রধানত দ্রাবিড়। তবে দ্রাবিড়রা কেমন ছিলেন এ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ আছে। আলেকজেন্ডারের সমসাময়িক গ্রীক বিবরণীতে গঙ্গারিড়ি বা বংঙ্গ-দ্রাবিড়ি নামে এক শক্তিশালী রাজ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। গঙ্গা-বিধৌত এ রাজ্যের বংঙ্গ-দ্রাবিড় জাতি ছিল অপরাজেয় শক্তি।টলেমী বলেন, গঙ্গা মোহনার সব অঞ্চলেই গঙ্গারিড়িরা বাস করে। তাদের রাজধানী গঙ্গা খ্যাতিসম্পন্ন বন্দর। তাদের মসলিন ও প্রবাল রত্ন পশ্চিম দেশে রপ্তানি হয়। তাদের মতো পরাক্রান্ত জাতি ভারতে আর নেই।
মোঃ আব্দুল মান্নান,
‘প্রাচীন বাংলা ও তার সংলগ্ন এলাকায় বাস করতো একটি সভ্যতা-সম্পন্ন জাতি বাস করত। তারা ছিল দ্রাবিড় জাতির একটি শাখা। এ উপমাহাদেশে দ্রাবিড় দের আগমন ঘটেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগে। তারা এসেছে সেমেটিকদের আদি ভূমি মধ্য এশিয়া থেকে। ব্যাবলিন বা মেসোপটামিয়া দ্রাবিড়দের উৎপওিস্হল। এই সেমেটিকরাই পৃথিবিতে প্রথম সভ্যতার আলো ছড়িয়েছে। তারাই ইয়েমেন ও ব্যাবিলনকে সভ্যতার আদি বিকাশভূমিরুপে নির্মাণ করেছে।পৃথিবিতে প্রথম লিপির প্রচলন দ্রাবিড় জাতিরই অবদান। সুপ্রাচীন এক গর্বিত সভ্যতার পতাকাবাহী এই দ্রাবিড় জাতির লোকরা ভারতবর্ষে আর্য আগমনের হাজার হাজার বছর আগে মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পা সভ্যতা নির্মাণ করেছিল। অনুরুপ সভ্যতা হয়তো তারা বাংলাদেশেও করেছিল। কিন্তু প্রাকৃতিক কারনে সেগুলোর চিহ্ন এখন নেই’।
আবুল মনসুর আহমদ,
‘তারা মহেঞ্জোদাড়ো ও হরপ্পার মতো সুন্দর নগরী প্রাক-বাংলায় নিশ্চয়ই নির্মাণ করেছিলেন। অবশ্য স্হানীয় নির্মাণ উপকরণের পার্থক্যহেতু স্হপতিও নিশ্চয় পার্থক্য ছিল। কিন্তু আজ সে সবের কোন চিহ্ন নাই। প্রাকৃতিক কারনে প্রাক-বাংলায় চিরস্হায়ী প্রাসাদ নির্মাণের উপযোগী মাল-মশলা যেমন দুস্প্রাপ্য, নির্মিত দালান কোঠার ইমারত রক্ষা করাও তেমনি কঠিন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ এরা নিশ্চিত শিকার। ময়নামতি, মাহাস্তানগড়ের ভগ্নাবশেষ দেখিয়া প্রাক-বাংলার সভ্যতার প্রাচীনণত্ব ও স্হপতির চমৎকারিত্ব আন্দাজ করা যায় মাএ, বিচার করা যায় না’।
তবে একটি ব্যাপার লক্ষণীয় টলেমী সহ অনেকে দ্রাবিড়দের প্রশংসা করলেও হিন্দু আর্য পন্ডিতগন দ্রাবিড়দের অসভ্য বলে অভিহিত করেছেন। যেমনঃ অজয় রায়,
‘আর্য আগমন পূর্বে এ অঞ্চলে যারা বাস করতো তাদের বলা হত অনার্য। এরা ছিল মুলত অর্ধ বর্বর জাতি’২
প্রাচীন বাংলার ধর্ম
দ্রাবিড়দের ধর্ম কি ছিল এটা নিয়ে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি। তাদের একটি নিজিস্ব ধর্মমত ছিল এবং তা ছিল সম্ভবত একেশ্বরবাদী। আর্যদের সাথে বিরোধ ও পরে জৈন, বুদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের জনপ্রিয়তা বিশ্লেষণ করে আব্দুল মান্নান তালিব বলেন,
‘সেমেটিক ধর্মের উওর পুরুষ হিসেবে এ এলাকার মানুষের তাওহীদবাদ ও আসমানি কিতাব সম্পকে ধারনা থাকাই স্বাভাবিক এবং সম্ভবত তাদের একটি অংশ আর্য আগমনকালে তাওহীদবাদ এর সাথে জড়িত ছিল। এ কারনেই শিরক বাদী ও পৌওলিক আর্যদের সাথে তাদের বিরোধ চলতে থাকে’। (বাংলাদেশে ইসলাম,৩৪)।
আর্যদের সাথে সংগ্রাম
আর্য আগমন বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঘটনার একটি। তারা ছিল যাযাবর জাতি। ঘোড়াকে তারাই প্রথম পোষ মানায়। তারা ছিল খুবই মেধবি কিন্তু যুদ্ধবাজ ও নিষ্ঠুর। তারা দ্রাবিড় প্রাধান পাঞ্জাব, সিন্ধু ও উওর ভারত খুব সহজেই দখল করে নেয়। সামরিক বিজয়ের সাথে তারা তাদের বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতি এ এলাকার মানুষের উপর চাপিয়ে দেয়। তাদের অত্যাচারে টিকতে না পেরে এই সব এলাকার দ্রাবিড়রা দক্ষিন ভারত, শ্রীলংকা ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। প্রায় সমগ্র উওর ভারত তাদের করতলে চলে যায়। কিন্তু তখন বঙ্গ অঞ্চলের  মানুষ আর্যদের বিরুদ্ধে রুখে দারায়। এর ফলে করতোয়া নদীর তীরে এসে আর্যদের জয় রথ থেমে যায়। সংগ্রামী পূর্ব পুরুষদের এ লড়াই এর ব্যাপারে অধ্যাপক মন্থমোহন বসু বলেন,
‘প্রায় সমস্থ উওর ভারত যখন বিজয়ী আর্য জাতির অধীনতা স্বীকার করিয়াছিল, বঙ্গবাসীরা তখন সগর্বে মস্তক উওোলন করিয়া তাহাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিল। শতপথ ব্রাহ্মণ বলেন, আর্যদের হমাগ্নি সরস্বতী তীর হইতে ভগলপুরের সাদানিরার (করতোয়া নদীর) পশ্চিম তীর পর্যন্ত আসিয়া থামিয়া যায়।অর্থাৎ সাদানিরার অপর পারে অব্যস্তিত বঙ্গদেশে তাহারা প্রবেশ করিতে পারেন নাই'। 
চলতে থাকে এই লড়াই। সস্মুখ সমরে না পেরে আর্যরা ভিন্ন পথ ধরে। তারা ধর্ম প্রাচার করতে ব্রাহ্মণদের পাঠায়। এবং সংস্কৃতিক ও ধর্মীয় দিক দিয়ে একটি অবস্থান করার চেষ্টা করে। ‘চার স্তরে বিভক্ত আর্য সমাজের ক্ষএিয়, বৈশ্য বা শুদ্র প্রথমে বাংলায় আসেনি। এদেশে প্রথম এসেছে ব্রাহ্মণরা বেদান্ত প্রচারের নামে’।লড়াই শুরু হয় দুই দিক দিয়ে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এ লড়াই চলে। আর্যদের সাহিত্য মাহাভারত, উপনিষদে ধর্ম রাজ্য নিয়ে দেবতা ও অসুরদের যে যুদ্ধের কাহিনী আছে তা মূলত আমাদের পূর্ব পুরুষ ও আর্যদের যুদ্ধের কাহিনী। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে জঘন্য মিথ্যাচার এর একটি।এ কাহিনীতে বেমালুম ভিলেনকে হিরো আর হিরোকে ভিলেন বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। (হায়রে এ জন্যই মনে হয় রবী ঠাকুর বলেছিল, যা লিখিবে তুমি তাহাই সত্য যা ঘটিবে তাহা নয়।)। Sir William Wilson Hunter, তার ‘The Annals of Rural Bengal’ বইয়ে উল্লেখ করেন,
‘সংস্কৃত সাহিত্যে বিবৃত প্রথম ঐতিহাসিক ঘটনা হল আদিম অধিবাসীদের সাথে আর্যদের বিরোধ। এই বিরোধ জনিত আবেগ সমানভাবে ছড়িয়ে রয়েছে ঋষিদের স্তবগানে, ধর্মগুরুদের অনুশানে এবং মহাকবিদের কিংবদন্তিতে’।
আর্যদের সাথে সংস্কৃতিক ও ধর্মীয় লড়াই এর ফল সরূপ বাংলাদেশের মানুষ নিরাকার একেশ্বরবাদী ধর্ম হওয়ায় জৈন এবং পরে বুদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে রাখাল দাস বন্দ্যোপাধ্যায় তার ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ বইয়ে বলেন,
‘আর্যরাজগনের অধঃপ্তনের পূর্বে উওরাপথের পূর্বাঞ্চলে আর্য ধর্মের বিরুদ্ধে দেশব্যাপি আন্দলন উপস্হিত হইয়াছিল। জৈন এবং বুদ্ধ ধর্ম এই আন্দলনের ফলাফল’। (২৭-২৮)
আর্যদের প্রভাব বিস্তার
খৃস্টপূর্ব ৪ শতক পর্যন্ত বাংলায় আর্যরা কোন রুপ প্রভাব বিস্তার করতে ব্যার্থ হয়। মৌর্য শাসন থেকে আর্যরা এদেশে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে।গুপ্ত আমলে তা আরও বৃদ্ধি পায়। ৬৩৭ খ্রীষ্টাব্দে গৌড়ের রাজ শশাঙ্ক-এর মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে একঘোরতর নৈরাজ্যের সৃস্টি হয়। যা প্রায় দেড়শো বছর স্থায়ী ছিল।একে মাৎস্যন্যায় যুগ বলা হয়। এই সময় বাংলাতে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের সৃস্টি হয় আত্মকলহ,গৃহযুদ্ধ,গুপ্তহ্ত্যা,অত্যাচার প্রভৃতি চরমে ওঠে। বাংলার এই দুরব্যস্থার সুযোগ নিয়ে হিন্দুরা এ দেশে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। এ সময়  বুদ্ধ ধর্মের মধ্যে হিন্দুদের প্রভাবে তান্তিকতা ও মূর্তি পুজা প্রবেশ করে দুই ভাগ হয়ে যায়। ‘ হীনযান ও মহাযান’। মহাযানপন্থীরা হিন্দুদের প্রভাবে তান্তিকতা ও বুদ্ধ মূর্তি পুজা শুরু করে। হীনযানপন্থীরা তান্তিকতা ও বুদ্ধ মূর্তি পুজা বিরোধী। ৪।
পাল শাসন : বাংলার ইতিহসের সোনালি দিন
৭৭৫ সালে মাৎস্যন্যায়ের সময় বাংলার বিশৃঙ্খলা দমনের জন্য বাংলার মানুষ গোপাল নামক এক সামন্তরাজা কে বাংলার রাজা হিসেবে নির্বাচিত করেন। পাল বংশ প্রায় ৪০০ বছর বাংলা শাসন করে। এ সময় বাংলার ইতিহাসের সোনালি সময়। এ সময় বাংলার বিভিন্ন জায়গার অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার গরে ওঠে যা ছিল আন্তজাতিক মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সাহিত্য চর্চা ব্যপকতা পায়। রচিত হয় চর্যাপদ। এ সময় বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক অতীশ দীপংকর বিখ্যাত শিক্ষবিদ জেতারীর বিদ্যালয় এ ভর্তি হন। জেতারীর বিদ্যালয় ছিল বরেন্দ্র অঞ্চলে। হিউয়েন সাঙ এর শিক্ষক শীলভদ্র জ্ঞান চর্চা করেনও এ সময়। বুদ্ধ ধর্ম তার মহানুভতা নিয়ে আরও পৌজ্বলিত হয়। তান্তিকতা ও বুদ্ধ মূর্তি পুজারি মহাযানপন্থীদের মধ্যে দুই ভাগ হয়ে যায় কালচক্রযান ও ব্জ্রযান। ব্জ্রযান শাখার মধ্যে সহজিয়া মতবাদের উদ্ভব হয় যারা তান্তিকতা ও বুদ্ধ মূর্তি পুজারি মহাযানপন্থীদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই সহজিয়া সম্প্রদায়ই সবচেয়ে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য চর্যাপদ রচনা করে।
এ সময় আর্য-ব্রাহ্মণ শাসিত পশ্চিম ভারত সুলতান মাহমুদের অভিযানে নাকাল থাকায় তারা সামরিক ভাবে বাংলায় কোন অনিষ্ট করার সুযোগ পায়নি। তবে চতুর ব্রাহ্মণ এ সময় তাদের প্রভাব বাড়াতে ‘Assimilation’ (আওিকরন) থিওরির আশ্রয় নেয়। বিভিন্ন রাজ পরিবারের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপণ করে। যার মাধ্যমে তাদের প্রভাব ব্যাপকিত হয়। এটা স্বীকার করে ডঃ নীহাররঞ্জন তার বইতে উল্লেখ করেন,
‘ পাল রাজাদের অনেকেই ব্রাহ্মণ রাজ পরিবারের মেয়ে বিয়ে করেছিলন। ফলে বৌদ্ধ ও ব্রাহ্মণ্র ধর্মের মধ্যে একটা পারস্পিক সন্মন্ধ গড়ে উঠেছিল’।


সেন শাসন বাংলার ইতিহসের ঘোর দুঃসময়
দ্বাদশ শতকে পালদের শাসন অবসান হয়। শুরু হয় বাংলার ইতিহসের ঘোর দুঃসময়। সেন শাসন। এদের বর্ণনা দিয়ে সৈয়দ আলী আহসান বলেন,
‘দ্বাদশ শতকে কর্ণাটক থেকে বহিরাগত সেনারা এসে যখন এদেশকে অধিকার করল, তখন তারা নিষ্ঠুর শোষণ-কার্যের মধ্য দিয়ে এদেশবাসিকে নির্যাতন করতে লাগল। সংস্কৃতিকে নিয়ে এল রাজসভা ও মন্দিরের অভ্যন্তরে… সেনদের আমলে দেশীয় ভাষা চর্চা সম্পূর্ণরুপে বন্ধ ছিল। সেনরা যে সংস্কৃতি নিয়ে এসেছিল তা ছিল হিন্দুদের এবং তাও সকল হিন্দুদের নয়। তা ছিল কৌলিন্যবাদী ব্রাহ্মণদের এবং অংশত ক্ষএিয়দের। শেষ রাজা লক্ষ্মন সেনের রাজদরবারে যে সমস্ত কবি-সাহিত্যিক ছিলেন, তারা সংস্কৃত ভাষায় কবিতা রচনা করেছেন’।
সেন রাজারা ছিলেন  বৈষ্ণব মতবাদের কঠোর অনুসারী। এ সময় বাংলায় পাইকারি হারে বুদ্ধদের হত্যা করা হয়। বর্ণ প্রথা চালু হয়। উপওি হয় ছএিশ জাতের। হিন্দুদের অত্যাচারে কয়েক কোটি বুদ্ধ নিহত হয়। যারা বেঁচে ছিল তারা লেপাল, মঙ্গলীয়া, বার্মা, সহ ঐসব এলাকায় পালিয়ে যায়। সবচেয়ে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য চর্যাপদ নেপালে পাওয়া যায় কারন সহজিয়া সম্প্রদায়  হিন্দুদের অত্যাচারে নেপাল চলে গিয়েছিল। এই হত্যাযজ্ঞ সম্পর্কে ডঃ দীনেশচন্দ্র সেন ‘Discovery of Living Buddhism in Bengal’ বই থেকে রেফার করেন,
‘যে জনপদে(পূর্ব বঙ্গে) এক কোটিরও অধিক বৌদ্ধ ছিল এবং ১৫৫০ ঘর ভিক্ষু বাস করিত, সেখানে একখানি বৌদ্ধ গ্রন্থ এিশ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই’।
মুসলমানদের আগমন
মুসলমানদের আগমন বাংলার ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি। ১২০৫-৬ সালের দিকে মুসলিম সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী সেন রাজবংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণ সেনকে মাত্র ১৮ জন সৈনিক নিয়ে পরাজিত করে গৌড় জয় করেন। এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো বাংলা জয় করেন। একেশ্বরবাদী সেমেটিক, জৈন এবং বুদ্ধ ধর্মের উওরধিকারি এদেশের মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বঙ্গ মুসলিম প্রধান জনপদে পরিণত হয়।
এখন প্রশ্ন পহেলা বৈশাখ ও বিশেষ করে তার প্রধান দুই আচার মঙ্গল শোভাযাএা ও মঙ্গলদ্বীপ জ্বালানো  কি আমাদের কখনও আমাদের পূর্ব পুরুষের সংস্কৃতির অংশ ছিল? বা পালন করতেন ? উওর না। দ্রাবিড় বা বঙ্গবাসী কখনও এমন উৎসব করেছেন এমন নজির নেই। আসুন একটু দেখার চেষ্টা করি কিভাবে এটা এল…
পহেলা বৈশাখ
ভারতবর্ষে মুঘল সম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর সম্রাটরা হিজরী সাল অনুসারে কৃষি পণ্যের খাজনা আদায় করত। কিন্তু হিজরি সন চাঁদের উপর নির্ভরশীল হওয়ায় তা কৃষি ফলনের সাথে মিলত না। এতে অসময়ে কৃষকদেরকে খজনা পরিশোধ করতে বাধ্য করতে হতো। খাজনা আদায়ে সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে মুঘল সম্রাট আকবর একটি নতুন সন প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। এছাড়া আকবরের থিংক ট্যাংকরা সব ধর্ম এক করে দ্বীন ই ইলাহির প্রচলন করেছিলো সেটাকে আরও দৃঢ় করতে ইসলামি হিজরি সালকে সরানোর চিন্তা করেন। এর পর আকবরের আদেশে তার অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা বাংলার বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি সৌর সন এবং আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে নতুন বাংলা সনের নিয়ম বিনির্মাণ করেন। এই সন বানানোর ক্ষেত্রেও ফতেহউল্লাহ সিরাজি দীন ই ইলাহির কৌশল অনুসরণ করেন। সন চালু করেন মুসলিমদের আরবি হিজরী সনের উপর ভিত্তি করে আর মাস গুলার নাম রাখেন হিন্দু মিথলজি থেকে। ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ই মার্চ বা ১১ই মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর করা হয় আকবরের সিংহাসন আরোহণের সময় (৫ই নভেম্বর, ১৫৫৬) থেকে। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। আকবরের সময়কাল থেকেই ইরানের নওরোজ এর অনুকরণে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন শুরু হয় প্রথম দিকে একে নওরোজই বলা হত।
পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাএা ও মঙ্গলদ্বীপ
লোকগবেষক আতোয়ার রহমান ‘বৈশাখ’ শীর্ষক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ‘বৈশাখ তার নামের জন্য বৈশাখ নক্ষত্রের কাছে ঋণী। পুরাণের মতে বিশাখা চন্দ্রের সপ্তবিংশ পত্নীর অন্যতম’। হিন্দু মিথ অনুযায়ি, ‘মাস হিসেবে বৈশাখের একটা স্বতন্ত্র পরিচয় আছে, যা প্রকৃতিতে ও মানবজীবনে প্রত্যক্ষ করা যায়। খররৌদ্র, দাবদাহ, ধু-ধু মাঠ, জলাভাব, কালবৈশাখীর ঝড় ইত্যাদি’৭। এ সকল অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য হিন্দুরা মঙ্গল শোভাযাএা করতো ও মঙ্গলদ্বীপ জ্বালাত। হিন্দু ব্যাবসায়ীরা হালখাতা খুলত। চৈত্রসংক্রান্তির দিনে (পহেলা বৈশাখ এর আগের দিন) তৈলবিহীন নিরামিষ ব্যঞ্জন রান্না করার রীতিরও প্রচলন ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের; পরদিন সমারোহে মাছ খাওয়ার সঙ্গতি বাঁচিয়ে রাখার কথা বিবেচনা করেই। বাঙালি মুসলিম ব্যাপক ভিওিতে পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপন এর নজির পাওয়া যায় না। তবে দ্রাবিড়দের মধ্যে ফসল কেটে নবান্ন উৎসব পালনের কথা পাওয়া যায়। এছাড়া ইবনে বতুতা ফসল কাটার উৎসব এর কথা উল্লেখ করেছেন। চর্যাপদের বিভিন্ন পদেও নতুন ফসল কাটার উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায়।
বাংলার মুসলিম সমাজে পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাএা ও মঙ্গলদ্বীপ
বাংলার মুসলিম সমাজে পহেলা বৈশাখ এর প্রচলন খুব অপ্ল দিনের। ‘ঢাকায় পহেলা বৈশাখের মূল অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দু সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট-এর গানের মাধ্যমে নতুন বছরের সূর্যকে আহবান। পহেলা বৈশাখ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে ছায়ানটের শিল্পীরা সম্মিলত কন্ঠে গান গেয়ে নতুন বছরকে আহবান জানান। স্থানটির পরিচিতি বটমূল হলেও প্রকৃত পক্ষে যে গাছের ছায়ায় মঞ্চ তৈরি হয় সেটি বট গাছ নয়, অশ্বত্থ গাছ। ১৯৬৭ সাল থেকে এ আচার শুরু হয়’৮। মঙ্গল শোভাযাত্রার আরও অপ্ল দিনের। মাএ ২৫ বছর হল। ১৯৮৯ সালে প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে পহেলা বৈশাখে সকালে মঙ্গল শোভাযাত্রার বের হয় ৯। মঙ্গলদ্বীপ আরও নতুন। মাএ কয়েক বছর হল এর প্রচলন হয়েছে।
পর্যালোচনাঃ
সবদিক পর্যালোচনা করে এ বিষয় গুলো আমরা নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি,
১ সুপ্রাচীন কাল থেকে পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাএা ও মঙ্গলদ্বীপ কখনও বাংলার মানুষের স্থানীয় বা ধর্মীয় সংস্কৃতি বা ঐতিহ্যের অংশ ছিল না।
২ মঙ্গল শোভাযাএা ও মঙ্গলদ্বীপ একটি ভ্রান্ত কুসংস্কার। এটা আমাদের পূর্ব পুরুষদের বিশ্বাস, সাংস্কৃতি, আধুনিক বিজ্ঞান এবং আমাদের ধর্মের সাথে সাংঘসিক।
৩  পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাএা ও মঙ্গলদ্বীপ আর্যদের সাংস্কৃতির অংশ যাদের বিরুদ্ধে আমাদের পূর্ব পুরুষ গন শত শত বছর যুদ্ধ করেছেন।
শেষ কথাঃ
আমরা পহেলা বৈশাখ পালন করতেই পারি যেহেতু আর্যদের সাংস্কৃতির অংশ হলেও এর মূল ধারা আর্যদের সাংস্কৃতির অংশ নয়। তবে এটা কোনভাবেই আমাদের বা আমাদের মহান পূর্ব পুরুষদের সাংস্কৃতির অংশ নয় অর্থাৎ বাঙালীর হাজার বছরের ঐতিহ্য তত্ত্ব্ নয়।
মঙ্গল শোভাযাএা অংশ নেওয়া ও মঙ্গলদ্বীপ জ্বালানো আমাদের পূর্ব পুরুষদের বিশ্বাস, সাংস্কৃতি, আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে প্রতারনা।
আর একটি লক্ষণীয় ব্যাপার হল কলকাতার মানুষ কিন্তু আমাদের একদিন পরে নববর্ষ পালন করে।

বৃহস্পতিবার, ১৪ জুলাই, ২০১৬

জামালুদ্দিন আফগানি: এক স্বাধীনতা সংগ্রামী রাহবার।

রাজা মহারাজাদের বাইরে উনিশ শতকে প্রাচ্য জগতের সবচেয়ে বিখ্যাত বিদ্বান ব্যক্তির নাম জামালুদ্দিন আফগান। তাঁর জন্ম ইরানে না আফগানিস্তানে, তিনি শিয়া না সুন্নী, তিনি তুর্কীর সুলতান না রাশিয়ার জারের চর-এই জাতীয় তর্ক তুলেছেন বিশ শতকের ইহুদী ও খৃষ্টান পণ্ডিতরা। তারা আফগানিকে দাঙ্গাবাজ প্রমাণের চেষ্টা করেছেন। রেজা শাহর ইরানেও কিছু পণ্ডিত তাঁর ইরানে জন্মের দাবি পেশ করেন। তাঁর জন্ম সন কেউ বলেন ১৮৩৮ কেউ ১৮৩৯। কিন্তু তিনি ইন্তেকাল করেছেন বিখ্যাত অবস্থায় ১৮৯৭ সালে। তারিখটা ৯ই মার্চ। তখন তিনি তুর্কী সুলতানের নজরবন্দী। সন্দেহ করা হয় তাঁর মৃত্যুর পেছনে সুলতানের হাত ছিল।
ঊনিশ শতকে ইউরোপীয় সাংবাদিকরা জামালুদ্দিনকে প্যান ইসলাম মতবাদের প্রবক্তারূপে পরিচিত করার চেষ্টা করতেন। এটাও ওরিয়েন্টালিস্টদের তৈরী করা গল্প। আজকাল যেরকম মৌলবাদ বলে একটা পশ্চিমা বোমা আমাদের সাংবাদিকরা বিনা বিচারে প্রতিদিন ফাটান প্যান ইসলামও তেমনই এক অপরক্ষীতি বোমার অধিক নয়। কিছুদিন আগেও দুনিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চলগুলোকে তৃতীয় বিশ্ব বলে পরিচয় দেয়ার এক রেওয়াজ ছিল। উনিশ শতকের তৃতীয় বিশ্ব বলা যেতো দুনিয়ার সকল উপনিবেশ ও অর্ধ-উপনিবেশ। জামালুদ্দিন আফগানি এই দুনিয়ার মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন। সেই স্বপ্নের শত্র“রা তাঁকে প্যান ইসলামিজম মতবাদের উকিল পরিচয় দিয়ে কিছু এক ঘরে করার কৌশল করেছেন। জামালুদ্দিন অনুরক্ত কবি ইকবাল যখন লেখেন সারা জাঁহা হামারা, তাতে এই শিক্ষকেরই কথা কবিতা রূপ পায় মাত্র। জামালুদ্দিন মানব বিশ্ব মানতেন।
অথচ জামালুদ্দিন যখন পরাধীন বৃটিশ ভারতে এসেছিলেন তখন তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে হিন্দু মুসলমান সকল ভারতবাসীর এক কাতার কামনা করেন। বিপিনচন্দ্র পাল প্রভৃতি হিন্দু নেতা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন কিন্তু বৃটিশ সরকার তাঁকে আলবার্ট হলে বক্তৃতা দিতে দেয়নি। বাংলায় পন্ডিত রেয়াজ অলদীন অল মহহাদী ‘সমাজ ও সংস্কার’ নাম দিয়ে ১৮৮০’র দশকে জীবনী বই লিখেছিলেন। বৃটিশ গভর্নমেন্ট সে বই বাজেয়াপ্ত করে তারা জামালকে কলিকাতা ছাড়া করে।
জামালের দেয়া গল্প অনুসারে তিনি ভারতের প্রথম স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রকাশ সিপাহী বিদ্রোহের যুগে ‘হিন্দুস্থানের মাদ্রাসায় পড়ালেখা করতে এসেছিলেন। ১৮৮৬-৬৮ সালে তিনি আফগানিস্তানের আমীর আজম খাঁর উপদেষ্টা হন। বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী তাঁর কাজকর্মের তখনই প্রকাশ্য সূত্রপাত। এরপর তিনি ইস্তাম্বলের নব প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ‘দারুল ফুনুন’ এ সম্মানিত অধ্যাপক মনোনীত হয়। সেখান থেকে তিনি মিশরে যান। ১৮৭১-৭৯ মিশরে অলি আজহারের বাইরে স্বাধীন শিক্ষক হিসেবে সে দেশের সেরা বুদ্ধিজীবীদের তিনি পড়াতেন। এই ছাত্রদের মধ্যে মোহাম্মদ আবদুল্লাহ পরে মিশরের জাতীয় মুফতি হন। ইংরেজরা মিশর দখল করে ১৯৮২ তে, জামালুদ্দিনকে তার অনেক আগেই সে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। দক্ষিণ ভারতের হায়দারাবাদে তার পরের আশ্রয় লাভ ঘটে। বৃটিশের ধামাধরা আলিগড় খ্যাত সৈয়দ আহমদ খানের বিরুদ্ধে তিনি “প্রকৃতিবাদের মোকাবেলা” নামে এক বই লেখেন। এই বই ইংরেজীতে “Refutation of the Materialist” নামে পরিচিত। এটি একটু উদ্দেশ্য প্রণোদিত অনুবাদ। জামালের মূল ফার্সিতে ব্যবহৃত শব্দটি “নেচারিয়া” বা “নেচার পন্থী”।
বৃটিশ গভর্নমেন্ট জামালকে প্রথমে অন্তরীণ ও পরে বহিষ্কার করেন। এরপর জামাল লন্ডন হয়ে প্যারিস যান। প্যারিস থেকে ইন্দু-ফরাশি সাম্রাজ্যের বিরোধের সুযোগ নিয়ে তিনি এক স্বাধীনতাপন্থী পত্রিকা বার করেন আরবী ভাষায়। এর নাম আল আরবা আল বুসকা বা “নাড়ির বাঁধন”। এই পত্রিকা ডাকযোগে যেখানেই পৌঁছতো সেখানেই স্বাধীনতার কর্মী তৈরী করতো। বৃটিশরা এই পত্রিকা দমনের চেষ্টা করেন। দু বছরের মধ্যে কাগজ বন্ধ হয়ে যায়। সুদানের মাহাজি, তুরস্কের সুলতান, ইরানের শাহ, রাশিয়ার জারের সাথে কাজ করবার সেরে তিনি ১৮৯১-৯২ সালে ইরানের প্রথম গণ আন্দোলনে শরীক হন। নাসিসুদ্দিন শাহ ইরানের কাজার বাদশা তাকে বের করে দেন। পরের কালে ইমাম আয়াতোল্লাহ খোমেনীর আমলে যা হয়েছে আফগানির অনুপ্রেরণায় ইংরেজ তামাক কোম্পানীর বিরুদ্ধে সার্বিক গতিরোধ ও বর্জন আন্দোলনে তার প্রথম পোশাক সহ মহড়া হয় বলে অনেকে মনে করেন।
১৮৯১-৯২ সালে নস হয়ে আফগানি আবার তুরস্কে আসেন। আফগানির ধ্যান ধারনার মধ্যে গণমুখীনতা স্পষ্ট অথচ তাকে রাজা বাদশাহরা কিছুদিন পাত্তা দিয়েছেন। যখন বাদশাহ নামাদার-আব্দুল হামিদ-দেখলেন তার শাহী কল্পনা অনুসারে আফগানি চলছেন না, তখনই তাকে আটক করা হয়। ১৮৯২ থেকে মৃত্যুর মুহুর্ত পর্যন্ত আফগানি ইস্তাম্বুলের কাছে বাদশাহর দেয়া এক বাড়িতে অন্তরীণ ছিলেন।
আফগানি পরাধীন ও অর্ধ পরাধীন প্রাচ্যের মুক্তি সৈনিক। এটাই তার বড় পরিচয় কিন্তু বিংশ শতাব্দীর রাজনীতি ও সাহিত্যে ইউরোপীয় প্রধানরা ওঁকে কেবল ধর্মীয় নেতা হিসেবে ছোট করার হেন প্রয়াস নাই করেন নি। ভারতেও তিনি কিছু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কারণে কোনঠাসা জামালুদ্দিন কতটা দূরদর্শী নেতা ছিলেন তা বুঝবেন যখন তিনি কলিকাতায় বক্তৃতা দিতে গিয়ে কিভাবে ভারতীয় ঐতিহ্যের গুনগান করছেন দেখবেন। স্মর্তব্য, এই সময় তার সমবয়সী শ্রী বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় “আনন্দমঠ” লিখে ফেলেছেন। কিছুদিন আগে পূণঃপ্রকাশিত (আমার দেশ আমার শতেক বইয়ে) নীরদচন্দ্র চৌধুরীর মূল্যায়ন জানা গেল। ভারতের মুসলমান জাগরণের আসল হোতার সম্মান তিনিও দিয়েছেন আফগানিকে।
আফগানির তাৎপর্য বোঝার দুইটা পদ্ধতি আছে। সৈয়দ আহমদ খান ইংরেজের কদমবুচি পছন্দ করতেন, আফগানি সেই কারণেই সৈয়দের সমালোচনায় অকৃপণ, অক্লান্ত ছিলেন আমাদের কালে মার্তিনিকের কালো মনীষী হযরত ফ্রানস ফানো এবং আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের আল্লামা ম্যালকম একস যে রকম যোদ্ধা আফগানিকে আমার সে রকম সাহসী মানুষ মনে হয়। আফগানি লেখাপড়া যতটা জানতেন ততটা লিখে যাননি। এটাই আমাদের পোড়া কপাল। তবু তৎকালে ইউরোপের মনীষীকুলশ্রেষ্ঠ বলে খ্যাত মৌলানা এর্নেস্ত রেনেসার সাথে তর্কে তিনি যে দীপ্ত ও সভ্যতার পরিচয় দিয়েছেন তা আজকের বর্ণবাদ বিরোধী সকল গণতন্ত্রের ফৌজকে সাহস দেয়।
পশ্চিমা ইহুদী ও খৃষ্টান পণ্ডিতরা জামালুদ্দিনকে চোট করার যে সব চেষ্টা করেছেন তার পেছনেও এই সত্য পুনঃপ্রমাণিত হয়। জামাল আপোষ করেন নি। না স্বৈরাচারী রাজা বাদশাহর সাথে। না বিদেশী ডাকাত চোর সওদাগর শাসকদের সাথে। জামালুদ্দিন সারা দুনিয়ার মজদুর বুর্জোয়া নির্বিশেষে স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রানপুরুষ।


জামালুদ্দিন আফগানি বড় মানুষ তার জীবন বড় কিন্তু সকল বড় মানুষের মত মৃত্যুর পর তিনিও বড় হয়েছেন আরো। মাত্র ৫৮/৫৯ বছর বেঁচেছিলেন এই মহান শিক্ষক। সংসার করেন নি, সম্পত্তির পেছনে মাথা কোটেননি। তার একমাত্র স্বপ্ন ছিল পরাধীন দেশের মুক্তি-যার বিহনে মনুষ্য কখনোই চিত্তের সম্যক স্ফুর্তি করতে পারে না।

বুধবার, ২৩ মার্চ, ২০১৬

ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের প্রতিষ্ঠাতা এবং আধ্যাত্বিক নেতা শহীদ ‎শায়খ আহমেদ ইয়াসিন রাহিমাহুমুল্লাহ


এক.
ফিলিস্তীন তখন ব্রিটিশদের অত্যাচার চলছে। প্রথম বিশ্বযুদ্বের পর ওসমানীয় খেলাফতের সমাপ্তি ঘটে এবং ফিলিস্তীনসহ আরবের বিরাট অংশ চলে যায় ব্রিটিশদের আন্ডারে। ১৯৩৭ এর কোন একদিন বর্তমান ইজরাইলের দখলকৃত আশকেলন শহরেরর এক গরীব মহল্লায় জন্ম নেন এক নবজাতক। পরবর্তীতে সন্ত্রাসী ইজরাইলের গলায় কাটার মত বিঁধে যান যিনি, যাকে নিয়ে বহু রাত নির্ঘুম কাটিয়েছে মোসাদের দূর্ধর্ষ এজেন্ট আর অপারেটররা এবং যার উত্তরসূরীরাই মূলত তেলআবিবের মাথাব্যাথার প্রধান কারণ এখন।
জন্মের মাত্র পাঁচ বছরের মাথায় পিতাকে হারান, বাড়ির পাশের এক স্কুলে পড়েন ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত। ১৯৪৮, ফিলিস্তিনী নকবা বা বিপর্যয়ের বছর। বনি ইসরাইলের অবাধ্য সন্তানেরা উড়ে এসে জুড়ে বসে গোটা আলকুদসের আশপাশে। একের পর এক শহর গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে থাকে, নিজ বাড়ি ছেড়ে পালাতে থাকে মুসলমানেরা। সে ধারাবাহিকতায় আহমেদ ইয়াসিনের পরিবার বাড়িঘর তালা মেরে অনির্দিষ্টকালের জন্য চলে যান গাজায় এক রিফিউজি ক্যাম্পে। বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছে একটা অসহায় পরিবার, কিছুদূর যেয়ে ফিরে ফিরে চাচ্ছে এক বালক সে পরিত্যক্ত বাড়ির দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের সামনে বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া হলো তার শৈশবের ভালবাসার উঠোন। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে বালক, মুঠো শক্ত হয়ে গেছে ১০ বছরের আহমেদ ইয়াসিনের। তখন ইজরাইলের কেউ যদি এ বালকের মনের আগুনের আঁচ টের পেত তবে বাড়িঘর বাদ দিয়ে তার উপরেই বুলডোজার চালিয়ে দিত।
ফিলিস্তিনসহ গোটা আরবের মুসলমানদের উপর এ অত্যাচার দেখে বসে বসে কাঁদেনি এ কিশোর। চোখে তার জ্বলে ওঠে আগুন। এ আগুন প্রতিরোধের, এ আগুন প্রতিশোধের।
সে আগুনেই পরবর্ততে বহুবার জ্বলেছে ইজরাইল। দীপ্ত কণ্ঠে বলেছেন তিনি, 'ফিলিস্তিনের সমস্যা আমাদের, আমাদেরকেই এর সমাধান করতে হবে। অস্ত্র ধরে প্রতিরোধে নামতে হবে। আমাদেরকে আরবের কোন দেশ বা আন্তর্জাতিক কেউ সাহায্য করতে আসবেনা।' 
সত্যিই তাই, হামাসের প্রতিষ্ঠার পর তা অক্ষরে অক্ষরে পরিষ্কার হয়ে গেছে।
গাজায় একদিন বন্ধুর সাথে কুস্তি খেলতে যেয়ে আঘাত পান মেরুদন্ডে। ৪৮ দিন প্লাস্টার নিয়ে পড়ে রইলেন বিছানায়। এরপরও বহুদিন চলল চিকিৎসা। কিন্তু শেষমেশ ডাক্তার জানিয়ে দিল পিচ্চি এ বালককে কুস্তি খেলার শাস্তি সারাজীবন ভোগ করতে হবে।
কিন্তু ডাক্তার জানতনা, যে পিচ্চির মনে ইজরাইলের সাথে কুস্তি লড়ার শখ সে কি এত সহজেই দমে যাবে ! বিছানা আর হুইল চেয়ারে বসে বসেই ইজরাইলেী সন্ত্রাসীদের সাথে লড়াই এর নকশা আঁকে সে বালক। হোক না পংগু, তাতে কি ! আল্লাহ চাইলে তো সবই সম্ভব।



দুই.
পুরো ফিলিস্তিন জুড়েই তখন চলছে অনাহারী মজলুমের আর্তনাদ। ১৯৫২ তে মেরুদন্ডে আঘাত পাবার আগের দিন পর্যন্তও আহমেদ ইয়াসিন নামের এই কিশোর ছুটে বেড়াতো পরিবারের অন্য মুখগুলোর জন্য অন্নের সন্ধানে। একটা রেস্টুরেন্টেও কাজ জুটিয়ে নিয়েছিল সে। মাঝে মাঝে গাজা-মিশর সীমান্তেও ঘুরে বেড়াত সে। মিশরীয় সৈন্যদের ফেলে যাওয়া খাবার বা পোষাক যদি কিছু পাওয়া যায়। কিন্তু অসুস্থ হয়ে যাবার পর সে জানল হুইল চেয়ার তার পরবর্তী জীবনের সংগী।
কিছুটা সুস্থ হলে স্কুলে যাওয়া শুরু হলো তবে হুইল চেয়ারে করে। ১৯৫৮ তে হাই স্কুল পাশ করে গেল হুইল চেয়ারে বসে সংগ্রামরত এ যুবক। পাশ করার পর একটা ছোট্ট চাকরীও যোগাড় করে ফেলল সে শারীরিক অক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও, একটা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতার কাজ।
মাত্র কদিন যেতে না যেতেই বই-পুস্তক তাকে আবার টানতে লাগল। হাই স্কুল পেরুনো এ যুবকের মনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দর ক্যাম্পাস ভাসছে ।
১৯৫৯ তিনি চলে গেলেন মিশরে। আইন শামস বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শুরু করলেন। অনেক কিছু শিখলেন এখানে। সবচেয়ে বড় যে ব্যাপারটা ঘটলো তার মগজে ইমাম হাসান আল বান্নার থিওরি ঢুকে গেল। পরিচিত হলেন ইখওয়ানুল মুসলিমিনের সাথে। মিশলেন তাদের সাথে, তার হৃদয়জুড়ে যে কষ্টের হাহাকার আর চোখজুড়ে যে আগুন জ্বলছিল তা প্রশমিত হবার পথ পেল। তখন হাজার হাজার পথ হারা যুবক অশান্তির আগুন থেকে বাঁচতে দলে দলে যোগ দিচ্ছিল ১৯২৮ সালে হাসান আর বান্নার প্রতিষ্ঠিত এ সংগঠনে। মিশরের জালেম শাসক দিশেহারা ইখওয়ানের চিন্তায়।
এরই মধ্যে কলেজ ডিপ্লোমার সার্টিফিকেট পেয়ে গেলেন। কিন্তু মিশরে তখন চলছে আরেক ফেরাউনের শাসন। সে ফেরাউনের নাম জামাল আব্দুন নাসের। মিশর কর্তৃপক্ষ বহুদিন ধরেই নজর রাখছিল বেশ কিছু ফিলিস্তিনী ছাত্রের উপরে। ইখওয়ানের উপরে ক্রমাগত ক্র্যাকডাউনের অংশ হিসেবেই গ্রেপ্তার হলেন আহমেদ ইয়াসিন। অভিযোগ আনা হলো তিনি মিশরের সরকার বিরোধী কার্যকালাপে জড়িত। জেল খাটলেন অল্প কদিন। কোর্টে তার উকিলের কঠিন যুক্তির মুখে ছাড়া পেলেন। জীবনের প্রথম জেল জীবনেই অনিয়ম-অনাচার আর অবিচারের প্রতি ঘৃণার সবচেয়ে বড় বীজ বপন করলেন তিনি। এভাবে চলতে দেয়া যায়না। আল্লাহর জমিনে মুসলমানরা কাফের-মুনাফিক উভয়ের হাতে অবিচার-জুলুমের শিকার হবে, এটা চেয়ে চেয়ে দেখার কোন রাস্তা নাই। নামতে হবে প্রতিরোধে । এ জুলুমের শেকড় উপড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে।
হুইল চেয়ারে করে আবার রওনা হলেন প্রিয় জন্মভূমির দিকে । এবার আর ছন্নছাড়া কাজ না, গোছানো কাজে হাত দিতে হবে। মাথারভর্তি বহু চিন্তা, প্ল্যান। কোন কোন সূত্রে জানা যায়, মিশর থেকেই তাকে গাজায় মুসলিম ব্রাদারহুডের ফিলিস্তিন শাখার স্থানীয় কোন দায়িত্ব দেয়া হয় এবং সে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে তিনি ফিরে আসেন গাজায়।

তিন.
মিশরে একটা জিনিশ তিনি স্পষ্ট বুঝে গেলেন, আরবদের সমস্যার সমাধান সম্ভব একমাত্র ইসলামী গণজাগরণেই। সেক্যুলার আরব শাসক আর আমেরিকা-ইজরাইলের চরিত্রে তিনি কোন ফারাক খুজে পেলেননা যখন দেখলেন পশ্চিমের অংগুলি নির্দেশে ইখওয়ানের উপর পাইকাড়ী হত্যা-গ্রেপ্তার চালানো হচ্ছে।
আল আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার প্রচন্ড ইচ্ছা ছিল তার এবং ভর্তিও হয়েছিলেন। কিন্তু শারীরিক সমস্যার কারণে তা অনেকটা অসম্ভব হয়ে পড়ে ফিলিস্তীনী এই পংগু যুবকের জন্য। অন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা ডিপ্লোমা নিয়েই গাজায় ফিরলেন আহমেদ ইয়াসিন যা আগের পর্বে এসেছে। ২২ বছর বয়সে বিয়ে করেন তারই আত্মীয় হালিমা ইয়াসিনকে ১৯৬০ সালে। ততদিনে তার মন-মগজে ঢুকে গেছে মানুষকে সত্যের দিকে দাওয়াতের বিভিন্ন পন্থা।
গাজায় নিজ বাড়িতে ফিরে বিভিন্ন বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জনে প্রচুর সময় ব্যায় করতে থাকলেন। রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন এবং ইসলামী ফিকহসহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় স্বাধীন বিচরণ করতে থাকলেন। এদিকে ইখওয়ানের ফিলিস্তীন শাখার প্রোগ্রামেও নিয়মিত দেখা যেত তাকে। গাজার আল-আব্বাসী মসজিদে জুমুআর নামাজে নিয়মিত খুতবা দিতে শুরু করলেন তিনি। তার গভীর জ্ঞান এবং মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকার হৃদয়গ্রাহী পন্থা মানুষকে আকৃষ্ট করতে শুরু করল। গাজার ওই মসজিদে তার বক্তব্য শুনতে প্রায়ই শখানেক যুবক ছেলেপুলে হাজির হতো, আর এরাই পরবর্তীতে হয়েছিল হামাসের নিউক্লিয়াস। পাশাপাশি তিনি একটা স্কুলে আরবি সাহিত্য এবং ইসলাম ধর্ম বিষয়ে শিক্ষকতা করতেন। স্কুলের ছেলে-মেয়েরা তার এ ক্লাসের সময় মুগ্ধ নয়নে কান খাড়া করে সব শুনতো, একজন পংগু মানুষ যে কিনা হুইল চেয়ারে ঘোরাফেরা করে সে কিভাবে এত জ্ঞানের অধিকারী হতে পারে সে বিস্ময়ে হতবাক হতো অনেকেই। গাজার সে স্কুলের শত শত ছেলে মেয়ের কাছে প্রিয় শিক্ষকে পরিণত হলেন সদা হাস্যজ্জ্বল আহমেদ ইয়াসিন।
যুবকদের মধ্যে জ্ঞান এবং জিহাদের অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে দেবার জন্য অদ্ভূত অদ্ভূত কৌশল ব্যবহার করতে থাকলেন। মসজিদে ২ মিনিটের সমাবেশ বা অমুক এলাকায় ৩ মিনিটের বক্তব্য এ ধরনের পন্থাতে গাজার নতুন প্রজন্মের মগজে আলো প্রবেশের ব্যবস্থা করছিলেন তিনি। পাশাপাশি ফিলিস্তীনী শহীদ-বাস্তুহারা পরিবারগুলোর লিস্ট করে তাদের জন্য সাহায্য কালেকশন এবং বিতরনের মত বিরাট উদ্যোগও নেন তিনি।
১৯৬৭ তে আরব-ইজরাইল যুদ্ধের সময় গাজাসহ পুরো ফিলিস্তীন দখল করে ফেলে ইজরাইল। পঙ্গু আহমেদ ইয়াসিনের নাম ছড়িয়ে গেছে গাজার আনাচে-কানাচে। ঘুমন্ত আরব সিংহদেরকে জাগানোর গান গেয়ে যাচ্ছেন তিনি, জাগরণ কিন্তু শুরুও হয়ে গেছে ততদিনে।
প্রতিরোধ-প্রতিশোধ এবং আল আকসার পুনরুদ্ধারের জন্য জ্বালাময়ী ভাষণ দিতেন নিয়মিত। দলে দলে যুবকেরা যোগ দিতে থাকল তার এসব সমাবেশে, তাদের বুকভর্তি আশা আর চোখভর্তি আগুন। সে আগুনে পুড়িয়ে দিতে চায় সন্ত্রাসী দখলদারদেরকে। চোখের সামনে নিজ প্রিয়জনকে খুচিয়ে খুচিয়ে হত্যার প্রতিশোধ নেবার একটা পথ বাৎলে দিবে কেউ তাদের এমনটাই তাদের চাওয়া। গোটা ফিলিস্তীন ঢুকে যাচ্ছে এক বিরাট অজগরের মুখে, তাকে রুখতে হবে। লড়তে হবে।
১৯৭৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন Al-Mujama Al-Islami নামের একটি সংগঠন যার নামের ইংলিশ অর্থ দাঁড়ায় the Islamic Charitable League। এই সংগঠন ব্যাপকভাবে জনসেবা এবং সামাজিক কাজ করতে লাগল যেমন ফ্রি ট্রিটমেন্টের ব্যবস্থা, ফ্রি স্কুলিং, মসজিদ এবং লাইব্রেরী নির্মান। ইজরাইল চাচ্ছিল তখনকার একমাত্র প্রতিরোধ আন্দোলন ফাতাহকে দূর্বল করার জন্য বিপরীতে কোন একটা সংগঠন তৈরী হোক আপাতত। আর পঙ্গু একজন মানুষের নেতৃত্বে দখলদারিত্বের মধ্যে অনর্থক এসব স্কুল-মসজিদ করার আন্দোলন ইজরাইলের জন্য খুব একটা ক্ষতির কারন হবেনা হয়ত এমনটাই ভাবত ইজরাইলের তখনকার নেতারা, তাই তারা সেভাবে বাঁধা দেয়নি আহমেদ ইয়াসিনকে প্রাথমিক দিকে । 

বেশকিছু বছর পেরিয়ে গেছে এরই মধ্যে। ১৯৮০ সালে Al-Mujama Al-Islami group পরিবর্তিত হল Al-Majahadoun Al-Philastiniyun নামক সংগঠনে। 
'মাজদ' এই সাংকেতিক নামে ছোট খাটো অপারেশন শুরু করল শাইখ আহমেদ ইয়াসিনের শিষ্যরা ১৯৮২ সালে। এ সকল অপারেশনের আর্থিক এবং অস্ত্র সাহায্য আসত ইখওয়ানের জর্ডান শাখার বেশ কিছু নেতার মাধ্যমে। সফলতাও আসতে থাকলো 'মাজদ' এর ছোট ছোট কাজগুলোর দ্বারা। ইজরাইল এই প্রথম টের পেল কেউ একজন তাদের পেছনে লাশের স্তুপ থেকে উঠে দাড়িয়ে অস্ত্র তাক করেছে তাদের দিকে।
আরবদের ঘাড়ে সাপের মত উঠে বসা ভয়ংকর ইজরাইলের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল ভবিষ্যতের বিপদের কথা চিন্তা করে।
মোসাদ সর্বোচ্চ শক্তি নিয়োগ করল এই গ্রুপের মাথা বের করার জন্য।
খুব অল্প কষ্টেই তারা গাজার বিখ্যাত আলেম এবং জনপ্রিয় নেতা শাইখ আহমেদ ইয়াসিনকে 'মাজদ' এর মূল হোতা হিসেবে বের চিহ্নিত করলো।
১৯৮৪ তে গ্রেপ্তার হলেন শাইখ আহমেদ ইয়াসিন।
ইজরাইলের পবিত্র প্রমিজড ল্যান্ডের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার এবং উস্কানীর অভিযোগে তাকে ১৩ বছরের জেল দিল অবৈধ ইজরাইলের অবৈধ আদালত।


চার.
১৯৮৫, মানে গ্রেপ্তারের ১ বছরের মাথায় তিনি মুক্তি পেলেন একটি বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে। এই বিনিময় চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল Popular Front for the Liberation of Palestine General Command নামক একটি প্রতিরোধ সংগঠন এবং ইজরাইল সরকারের মধ্যে, ফিলিস্তিনের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আহমেদ জিবরিল। সম্ভবত দু-একজন ইজরাইলি সৈন্যের বিপরীতে কয়েকশ ফিলিস্তিনী মুক্তি পায় সে বার।
আহমেদ ইয়াসিন হামাস প্রতিষ্ঠা করলেন ১৯৮৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে। আরবী 'হামাস' মানে 'enthusiasm' বা উদ্দীপনা, প্রবল আগ্রহ/উদ্যোম। শায়খ আহমেদ ইয়াসিনের সাথে এসময় ছিলেন গাজার একদল আলেম এবং ইসলামিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর প্রধান সহযোগী হিসেবে ছিলেন ডা. আব্দুল আজিজ রানতিসি যিনি পরবর্তীতে আহমেদ ইয়াসিনের শাহাদাতের পর হামাসের প্রধান হয়েছিলেন এবং নিজেও শহীদ হয়েছিলেন ইজরাইলি বিমান হামলায়।
হামাসের জন্মের সাথে সাথে ফিলিস্তিনীরা নতুন উদ্যোমে প্রতিরোধ শুরু করল। বহু ফিলিস্তিনীর মধ্যে আশার সঞ্চার হল। হামাসের প্রতিষ্ঠার বছরেই শুরু প্রথম ইন্তিফাদা বা ফিলিস্তিনীদের গণজাগরণ এবং প্রতিরোধ। মূলত প্রথম ইন্তিফাদার পেছনে হামাস নেতাদের ভূমিকাই ছিল মূখ্য এবং এই ইন্তিফাদা পরিচিত হয়েছিল 'মসজিদের বিপ্লব' হিসেবে কারন এ আন্দোলন উঠে এসেছিল মসজিদ থেকে।   হামাস শুরু করল ইজরাইলি দখলদারদের উপরে হামলা। গাজা উপত্যকাতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ইজরাইলি সৈন্য নিহত হল প্রথম ইন্তিফাদাতে।
ইজরাইল আবারো শায়খ আহমেদ ইয়াসিনকে এসব হামলার প্রধান পরিকল্পনাকারী বলে অভিযুক্ত করে গাজাতে তার বাড়িতে সৈন্য পাঠিয়ে হামলা করে তছনছ করে দিল। শায়খকে শাসিয়ে দেয়া হল যে তাকে লেবাননে নির্বাসনে পাঠানো হবে যদি সে এসব কাজ অব্যাহত রাখে।
১৯৮৯ সাল, প্রথম ইন্তিফাদার দুবছর পর আবার গ্রেপ্তার হলেন হামাসের প্রতিষ্ঠাতা। হুইলচেয়ারসহ তাঁকে তুলে নিয়ে গেল দখলদাররা, বিভিন্নরকম নির্যাতন চালিয়ে এবার ৪০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হল। প্রধান অভিযোগ ছিল তাঁর বিরুদ্ধে ইজরাইলী সৈন্যদেরকে হত্যা, কিডন্যাপ এবং স্বশস্ত্র  প্রতিরোধ আন্দোলন  হামাসের প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেওয়া।


পাঁচ.
কারাগারে ক্রমাগত অত্যাচার আর ভয়াবহ নির্যাতনে তিনি ডান চোখের দৃষ্টি হারালেন, বাম চোখও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হল। এমনিতেই অসুস্থ্য ছিলেন, এই দূর্বল শরীর একে একে আক্রান্ত হতে থাকল দূরারোগ্য সব রোগে। ফুসফুস, হার্ট, কান, পাকস্থলি, বৃহদান্ত্র কিছুই বাদ গেলনা ।
১৩ ই ডিসেম্বর ১৯৯২, হামাসের মিলিটারি উইং ইজ্জেদ্দিন আল কাসসাম ব্রিগেড একটি সফল অপারেশনে এক ইজরাইল সেনাকে আটক করে। তারা ইজরাইলকে এই সৈন্যের বিনিময়ে তাদের সম্মানিত নেতা আহমেদ ইয়াসিনসহ আরো বেশকিছু বৃদ্ধ ও অসুস্থ্য নেতাকে ছেড়ে দেবার আহ্বান জানায়।
কিন্তু ইজরাইল অস্ত্রেই সামধান ঠিক করল, কমান্ডো আক্রমণ চালানো হল সেই বাড়িতে যেখানে আটক ছিল ইজরাইলি সেনা। ভয়াবহ সংঘর্ষ হল কাসসামের যোদ্ধাদের সাথে। কাসসমামের তিনজন শহীদ হল, অন্যদিকে ইজরাইলের সেই আটক সেনাসহ নিহত হল মোট চারজন। এই চারজনের মধ্যে ইজরাইলি কমান্ডো ইউনিটের  প্রধানও ছিল।

১৯৯৭,শায়খ আহমেদ ইয়াসিনের কারাজীবন অষ্টম বছরে তখন।
হামাসের পলিটিক্যাল ব্যুরোর চীফ খালেদ মাশালকে গুপ্তহত্যার মিশনে যেয়ে মোসাদের দুই স্পেশাল এজেন্ট হামাসের হাতে ধরা পড়ে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে ।  ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিল সে ঘটনা। মৃত্যুশয্যা থেকে ফিরে এলেন খালেদ মাশাল এবং অনেকগুলো বড় অর্জনের মধ্যে হামাস সবচেয়ে বড় যে জিনিশটা পেল সেটা হচ্ছে তাদের নেতা আহমেদ ইয়াসিনকে। তেলাবিব থেকে হেলিকপ্টারে করে অসুস্থ লিডারকে আম্মানে এনে হামাসের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হল ইজরাইল এবং বিনিময়ে তারা ফিরে পেল তাদের দু স্পেশাল এজেন্টকে। এছাড়া খালেদ মাশালকে হত্যার উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা বিশেষ ধরনের বিষের এন্টিডোটও হামাসের হাতে তুলে দিতে বাধ্য করা হয় ইজরাইলকে।  এ ঘটনায় মধ্যস্থতা করেছিলেন জর্ডানের তৎকালীন বাদশা হুসাইন। অবশ্য এর পেছনে জর্ডানের নিজের স্বার্থ এবং রাজনৈতিক ইজ্জ্বতও জড়িত ছিল।
মোসাদের ইতিহাসে এমন বিপর্যয় সম্ভবত আর দ্বিতীয়টি নাই।
এরপর জর্ডানের মিলিটারি হাসপাতালে  সাময়িক চিকিৎসা শেষে তিনি আবার সরাসরি উড়াল দিলেন প্রিয় ভূমি গাজায়। গাজায় সেদিন লাখ লাখ মানুষের ঢল নেমেছিল প্রিয় নেতাকে স্বাগত জানাতে। আহমেদ ইয়াসিনকে যখন জেরুজালেমের উপর দিয়ে নিয়ে আসছিল হেলিকপ্টার তখন তিনি বেড থেকে বারবার মাথা উচিয়ে প্রিয় বায়তুল মুকাদ্দাসকে এক নজর দেখার চেষ্টা করছিলেন অস্থিরভাবে, বারবার চেষ্টা করেও তাকে বিরত রাখা যাচ্ছিলনা।   


ছয়.
হামাসের এই বিজয় এবং গাজায় তাদের নেতার প্রত্যাবর্তন স্বভাবতই বিরাট প্রভাব ফেলল সংগঠনটির উপরে। প্রভাব পড়ল পুরো ফিলিস্তিনে।  আকুণ্ঠ দূর্নীতি এবং বেঈমানীতে ডুবে থাকা ফাতাহর নেতারা বুঝতে পারল তাদের সামান্তরালে দাড়িয়ে গেছে হামাস এবং ফিলিস্তিনী যুবকদেরকে দলে দলে হামাসে যোগ দিতে দেখে এও বুঝতে পারল যে তারা না চাইলেও ফিলিস্তিনের নেতৃত্বে খুব দ্রুতই পরবির্তন আসছে, এ পরিবর্তন ছিল অবধারিত। জনস্রোতকে আটকানোর ক্ষমতা মাহমুদ আব্বাসদের ছিলনা। তাছাড়া হামাসের প্রতিষ্ঠার পর থেকেই আহমেদ ইয়াসিন ক্রমেই ফিলিস্তিন নিপীড়িত মানুষের প্রধান নেতা হয়ে উঠেছিলেন, আরবসহ গোটা বিশ্বের মানুষের কাছে তাঁর একটা পাওয়ারফুল ইমেজ তৈরী হয়েছিল। গাজায় ফিরে এক ভাষণে তিনি ফিলিস্তিনীদের ঐক্যবদ্ধ আহ্বান জানান। ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বাধীন PA বা প্যালেস্টাইনিয়ান অথরিটির সাথে অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং আদর্শগত দ্বন্দ্ব থাকার পরও তিনি PA এর সাথে সম্মিলিতভাবে সবখানে ফিলিস্তিনীদেরকে প্রতিরোধের জন্য তৈরী হতে বলেন।

কেন এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল তারা?
অসলো চুক্তির পর থেকেই ইয়াসির আরাফাত এবং তার দল ফাতাহর প্রতি সমর্থন কমতে থাকে ফিলিস্তিনীদের। শান্তির মুলো দেখে অস্ত্র ত্যাগ করে ইজরাইলকে স্বীকৃতি দিয়ে দেন এক সময়কার  সংগ্রামী নেতা ইয়াসির আরাফাত। কিন্তু প্রকৃত শান্তি কোনদিনই আসেনি ফিলিস্তিনীদের জীবনে, তারা যে অসলোতে বিরাটভাবে প্রতারিত হয়েছে এটা ক্লিয়ার হয়ে যাচ্ছিল তাদের কাছে। আরব শাসক এবং ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আসা কাড়ি কাড়ি টাকার সুফল সাধারণ ফিলিস্তিনীরা পেতনা, সে টাকা চলে যেত ফাতাহর নেতাদের একাউন্টে। শায়খ আহমেদ ইয়াসিন খুব স্পষ্ট করে সবসময়ই এই অসলো চুক্তিকে বলতেন 'বিরাট প্রতারণা' এবং 'লজ্জ্বাকর আত্মসমর্পণ'। ফিলিস্তিনীদের জমি কেড়ে নেয়া থেমে থাকেনি এত কিছুর পরও। দখলকৃত ফিলিস্তিনের জমিতে ফিলিস্তিনীরাই হয়ে গেল দাসের মত তৃতীয় শ্রেণীর নাগরিক। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিম তীর এবং গাজা উপত্যকায় পরবর্তী জায়োনিস্ট সরকারগুলো কর্তৃক ব্যাপকহারে ইহুদী বসতি নির্মাণ এবং ক্রমাগত ফিলিস্তিনি জমি অধিগ্রহণ অনেক ফিলিস্তিনির জন্য শায়খের চিন্তাধারাকে সমর্থনের কারণ হয়ে দাড়িয়েছিল। ঘর-বাড়ি হারা মানুষদের কষ্ট আর এক বুক ব্যাথায় এগিয়ে আসে হামাস। অবৈধ ইজরাইলকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে এবং তাদের আত্মরক্ষার কোন অধিকারই নাই স্বীকৃতি তো দূরের কথা, হামাস নেতাদের এমন কথাই আশান্বিত হত ফিলিস্তিনের তরুণরা।  হামাসের ঝুলিতে ছিল ভিক্ষার টাকা, ফাতাহর নেতাদের মত কাড়ি কাড়ি টাকা তাদের জন্য আসতনা। সেই অল্প পরিমাণ টাকা খুব পরিকল্পিতভাবে তারা  মানুষের জন্য ব্যায় করত। প্রায় সব ফিলিস্তিনীই মনে-প্রাণে বিশ্বাস করত যে তারা একদিন তাদের হারানো বাড়িঘর আবার ফিরে পাবে, হামাসেরও কথা ছিল এমনই। আজ হোক কাল হোক ফিলিস্তীন পুরোপুরী মুক্ত হবেই, হামাস নেতাদের এমন বক্তব্য শুধু যে ফাঁকা বুলি না তা তাদের কাজে টের পেয়েছিল জনগণ। এছাড়া বিভিন্ন দ্বন্দ্ব থাকার পরও ফাতাহর সাথে কখনও সংঘর্ষ বা ঝামেলাতে যেতে চায়নি হামাস। আহমেদ ইয়াসিন সবসময়ই ফিলিস্তিনীদের নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষ এড়ানোর পন্থা খুজতেন এবং বহুবার তিনি ইয়াসির আরাফাতের সাথেও বসেছেন এ নিয়ে আলোচনার জন্য। নিজেদের মধ্যে লড়াই প্রতিরোধকে দূর্বলই করবেনা বরং তা চূড়ান্ত বোকামী হবে এবং আদর্শগতসহ সকল মতপার্থক্য পাশে সরিয়ে রেখে প্রধান সমস্যা অর্থাৎ ইজরাইলি দখলদারদের বিরুদ্ধে এক হতে হবে যে কোন মূল্যে গাজা ও ওয়েস্ট ব্যাংকের সকল মানুষকে এই নীতিতেই বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। ফলে পুরো ফিলিস্তিনের কাছে সবচেয়ে সম্মানিত নেতা ছিলেন তিনি, ছিলেন ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের প্রতীক।  


সাত.
ইয়াসিন গৃহযুদ্ধ প্রত্যাখ্যান করলেন
২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় ইন্তিফাদা বা গণ-অভ্যুত্থান শুরুর পূর্বে ইয়াসিনকে গৃহবন্দি করা হয়। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ যা আমেরিকা এবং জায়োনিস্টদের প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিল হামাস ও ইসলামিক জিহাদের লাগাম টেনে ধরার জন্য, ইয়াসিনের টেলিফোন যোগাযোগ কঠোরভাবে নজরদারি করছিল। হামাস নেতা সবসময় সতর্ক ছিলেন যাতে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের সাথে সংঘর্ষের পুনরাবৃত্তি না ঘটে যা গৃহযুদ্ধে মোড় নিতে পারে , যাকে তিনি দেখতেন ‘ফিলিস্তিনের চূড়ান্ত রেড লাইন’ হিসেবে। ইয়াসিন চেষ্টা করতেন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এবং আরব বিশ্বের সরকারগুলোর সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে; তার বিশ্বাস ছিল বিভক্ত নেতৃত্ব ফিলিস্তিনি স্বার্থকে দুর্বল করে ফেলবে। 


ইয়াসিন ফিলিস্তিনিদের শান্তিপূর্ণ জীবন-যাপনের অধিকারের উপর জোর দিয়েছিলেন
আল আকসা ইন্তিফাদা অর্থাত ২য় ইন্তিফাদা চলাকালে শায়খ প্রতিরোধের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। তাঁর যুক্তি ছিল স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে হয়, রৌপ্যের থালায় করে দেয়া হয়না আর জোরপূর্বক যে স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে, তা কেবল শক্তি খাটিয়েই পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। তিনি জায়োনিস্টদের বিরুদ্ধে আত্মঘাতী বোমা হামলাকে পুরোপুরি সমর্থন দিয়ে গেছেন। তার ব্যাখ্যা ছিল এটাই ফিলিস্তিনিদের একমাত্র অস্ত্র শক্তিশালী এক শত্রুর মুখে যে কিনা ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ ও উৎখাতের ব্যাপারে নাছোড়বান্দা। সাধারণ ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং ইউনিফর্মবিহীন জায়োনিস্টদের লক্ষ্য করে সকল প্রকার হামলা বন্ধে তিনি বারবার আহবান জানান। কিন্তু জায়োনিস্টরা সবসময় এ প্রচেষ্টাগুলোকে সফল হতে দিতে অস্বীকার করেছে। এছাড়া প্রথম ইন্তফাদার সময় ইজরাইলকে তিনি আহ্বান জানান ১৯৬৭'র সীমানায় ফিরে গাজা এবং ওয়েস্ট ব্যাংক থেকে দখলদার সেনা প্রত্যাহার করে নেবার জন্য, বিনিময়ে ইন্তফাদার সমাপ্তি টানার আশ্বাস দেন তিনি। কিন্তু অস্ত্রের ভাষায় কথা বলতে যারা পছন্দ করে বেশী সেই ইজরাইল এ ধরনের প্রস্তাব তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়।

শায়খকে হত্যার প্রথম প্রচেষ্টা
সেপ্টেম্বর ২০০৩ সালে প্রথম তার জীবনের উপর জায়োনিস্টদের হামলার পর তার হাজারো সমর্থক তার দিকে তাকিয়ে রয়েছিল প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞার জন্য। এটাই ছিল বিশ্বব্যাপী লক্ষ-কোটি মুসলিমদের প্রতিচ্ছবি, যা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছিল নতুন উদ্দীপণা এবং সমগ্র উম্মাহর মাঝে জিহাদের ডাক।
যাই হোক, হামাসের মত একটি আদর্শবাদী দলের ক্ষেত্রে, যেখানে নেতার চেয়ে আদর্শই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আহমাদ ইয়াসিনের মৃত্যুতে আন্দোলন স্থায়ীভাবে দুর্বল হয়ে যাবার কোন কারণ ছিলোনা। প্রকৃতপক্ষে তার বয়স এবং শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি কয়েক বছর পূর্বে থেকেই আন্দোলনের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনা থেকে অব্যাহতি নিয়েছিলেন।
শায়খ আহমাদ ইয়াসিন গাজার আল সাবরা এলাকায় তার সাধারণ বাড়িতে থাকতেন। সেপ্টেম্বর ৬, ২০০৩ এ গাজায় তার এক বন্ধুর সাথে সাক্ষাত করতে যাবার সময় তার জীবনের উপর ব্যর্থ হামলা চালায় জায়োনিস্ট দখলদারেরা। তিনি এ দফা বেঁচে গেলেও ডান হাতে সামান্য চোট পান। গুরুতর শারিরীক অক্ষমতা সত্ত্বেও তিনি তার মৃত্যু পর্যন্ত হামাস এবং ফিলিস্তিনের ইসলামী শিবিরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

আট.
শাহাদাত
২০০৩ এর ৬ সেপ্টেম্বর তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে ইজরাইল ৫৫০ পাউন্ড ওজনের বোমা নিক্ষেপ করে জঙ্গি বিমান থেকে, কিছুটা আহত হলেও বেঁচে যান তিনি। ১৯৮৮ সালে তিউনিশিয়াতে ফিলিস্তিনী কমান্ডে চীফ খলিল আল ওয়াজিরকে হত্যার পর এত বড় হাই প্রোফাইল নেতাকে হত্যার মিশনে তেল আবিব নেমেছে অনেকদিন পর, মিশনের ব্যাপারে হোয়াইট হাউস গ্রিন সিগন্যাল দিলে তা অনুমোদিত হয় ইজরাইলি মন্ত্রিসভাতে। তার উপর এই হামলার পর আল ক্বাসসাম ব্রিগেড এবং আল আক্বসা ব্রিগেড যৌথভাবে ইজরাইলীদের উপর আত্মঘাতি বোমা হামলা চালায় জেরুজালেমে।  ইজরাইল আবার প্ল্যান করতে থাকে ইয়াসিনকে চিরতরে শেষ করে দেবার জন্য। পরের বছর ১৬ ই জানুয়ারি ইজরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ঘোষনা করেন শায়খ ইয়াসিন 'মৃত্যুর জন্য চিহ্নিত' হয়ে আছে। তিনি হামাসের প্রতিষ্ঠাতাকে লক্ষ করে বলেন, 'তার উচিৎ মাটির নিচে যেয়ে লুকানো যেখান থেকে সে দিন-রাতের পার্থক্য বুঝতে পারবেনা এবং আমরা তাকে টানেলের ভিতর পেলেও টানেল সহই তাকে শেষ করে দিব'।
কদিন পরেই ইয়াসিন উত্তরে বলেন, 'আমাদেরকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে লাভ নাই কারন আমাদের মুখে সবসময়ই থাকে শাহাদাতের বাণী, যে কোন সময় শহীদ হওয়ার সৌভাগ্যই আমরা কামনা করি' !

২২ মার্চ, ২০০৪
ভোর সাড়ে চারটা
গাজার মসজিদগুলো থেকে ফজরের আজান ভেসে আসছে। মধ্য গাজার আল-শাবরা এলাকা। শায়খ আহমেদ ইয়াসিন নামাজের জন্য যখন রওনা দিচ্ছেন পাশেই ইসলামিক এসোসিয়েশন মসজিদের উদ্দেশ্যে। তিনি নিয়মিত সেখানেই ফজরের নামাজ আদায় করেন।
অন্যদিকে ঠিক  তখনই তেলআবিবে ইজরাইলি ডিফেন্স ফোর্সের কয়েকটি এফ-১৬ জঙ্গি বিমান এবং একটি এপাচে হেলিকপ্টার গানশিপ রেডি হচ্ছে ইয়াসিন হত্যা মিশন শুরু করার জন্য। সে মিশন সরাসরি তত্বাবধান করছে ইজরাইলি প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন। আহমেদ ইয়াসিন নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হলেন। তাঁর সাথে সবসময়ই হামাসের কয়েকজন সশস্ত্র মেম্বার থাকেন। তারা মসজিদ থেকে বের হতে হতেই মাথার উপর দিয়ে ইজরাইলি ফাইটার জেট উড়ে যাবার শব্দ পেলেন।  মসজিদের সামনে রাস্তায় রাখা গাড়ির দিকে এগুতে এগুতেই তাদের মাথার উপরে পৌছে গেল ইজরাইলি এপাচে। কোনরকম বিলম্ব ছাড়াই আহমেদ ইয়াসিনের হুইল চেয়ার লক্ষ করে আমেরিকার তৈরী 'হেল ফায়ার' মিসাইল নিক্ষেপ করা হল হেলিকপ্টার থেকে।
কিছুক্ষণ পরেই চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হুইল চেয়ারের অংশগুলো কুড়িয়ে আনে স্থানীয়রা, কুড়িয়ে আনে প্রিয় নেতার ছ্ন্নি-ভিন্ন হয়ে যাওয়া দেহের বিভিন্ন অংশ।
সেদিন তিনজন বডিগার্ডসহ তিনি শহীদ হন, এছাড়া মসজিদ থেকে নামাজ শেষে বেরুনো মুসল্লিদের মধ্যে থেকে আরো ৫ জন শহীদ হন। গুরুতর আহত হয় প্রায় ১৭ জন যাদের মধ্যে শহীদ ইয়াসিনের দুই পুত্রও ছিল।

আহমেদ ইয়াসিনকে ইজরাইল হত্যা করলেও হত্যা করতে পারেনি তার রেখে যাওয়া প্রতিরোধ আন্দোলনের আগুনকে। বরং তা লাখগুন বেশী তেজে জ্বলে উঠেছে। ফিলিস্তিনসহ গোটা দুনিয়ার মানুষের কাছে তিনি জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের প্রতিরোধের মূর্ত প্রতীক। সুবিচার-ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সংগ্রামরত কর্মীদের কাছে তিনি জীবন্ত কিংবদন্তি। মজলুম গণমানুষের কাছে একজন স্বর্গীয়-স্বপ্নপুরুষ তিনি। অনেকে তাঁকে বলেন দ্বিতীয় নুরুদ্দিন জঙ্গি যার তৈরী করা পথে হয়ত আবার হাজার বছর পরে  দ্বিতীয় কোন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর দেখা পেতে যাচ্ছে জেরুজালেমের খেজুর বিথীকা । বিশ্বের পঞ্চম শক্তিশালী আর্মির সামনে দাঁড়িয়ে একজন পঙ্গু-অচল মানুষ যে প্রতিরোধের আগুন জ্বেলেছিলেন সে আগুন সামাল দিতে আজ হিমশিম খাচ্ছে সন্ত্রাসী ইজরাইল এবং তার দোসররা।   আল্লাহ চাহেন তো তাঁর রেখে যাওয়া এই আগুনেই ছারখার হয়ে যাবে এই শতাব্দীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট-নিষ্ঠুুর এই সন্ত্রাসী অবৈধ দখলদার রাষ্ট্র। মুক্ত হবে আমাদের  প্রিয় নবী করিম (সা.) এর মিরাজসহ শত শত নবী-রাসূলগণের স্মৃতি বিজড়িত  বায়তুল মুক্বাদ্দাস, আমাদের প্রথম ক্বিবলা। সবশেষে শহীদ শায়খ আহমেদ ইয়াসিনেরই একটা উক্তি দিয়ে ইতি টানছি, 'আমি জানি আমাদের এই পথ অনেক কঠিন, রক্তপিচ্ছিল এবং বিপদসংকুল কিন্তু ভবিষ্যৎ আমাদেরই  ইনশাআল্লাহ...'

শনিবার, ৫ মার্চ, ২০১৬

ক্রুসেড

ক্রুসেড অর্থ ধর্মযুদ্ধ ।মূলতঃ পবিত্রভূমি জেরুজালেমের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে ইউরোপের খ্রিষ্টান ও প্রাচ্যের মুসলমানদের মধ্যে এগার শতক হতে তের শতক (১০৯৬-১২৯২ খ্রিঃ) পর্যন্ত সুদীর্ঘ প্রায় দুইশত বছর ব্যাপি যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংগঠিত হয় তা-ই ইতিহাসে ক্রুসেড নামে পরিচিত ।এ সময় দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সংগঠিত এ যুদ্ধ মধ্যযুগীয় ইউরোপ ও এশিয়ার ইতিহাসে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা ।ইউরোপিয় খ্রিষ্টানগণ তাঁদের ধর্মীয় নেতা পোপের নির্দেশে বুকে ক্রুস চিহ্ন নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল এবং ক্রুসকেই যুদ্ধের পতাকা হিসেবে ব্যবহার করেছিল বলেও এ যুদ্ধ ইতিহাসে ক্রুসেড নামে পরিচিত।
তবে মুসলমান গবেষকগণ সহ অধিকাংশ ইউরোপীয় ঐতিহাসিক ও লেখক কতৃক মুসলিম জাতির সাথে খ্রিষ্টানদের প্রতিটি সংঘর্ষকে ক্রুসেড নামে আখ্যায়িত করার সমালোচনা করেছেন ।এশিয়ার মুসলমান এবং ইউরোপের খ্রিষ্টানদের মধ্যে বিরাজিত সুদীর্ঘকালের ঘৃণা,বিদ্বেষ ও দ্বন্দ্ব কলহের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই ক্রুসেড বা ধর্ম যুদ্ধে ।তাই এই ক্রুসেডের কারণ ছিল যেমন বহুবিদ তেমনি এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী ।

✪✪ক্রুসেডের প্রেক্ষাপটঃ ✪✪ 

ক্রুসেডের প্রেক্ষাপট ভালোবভাবে জানতে হলে এর পিছনের কাহিনী জানতে হবে। ৬৩৬ সালে মুসলিম সেনাপতি আমর ইবনুল আস জেরুজালেম অবরুদ্ধ করেন। সে সময় খলিফা ছিলেন হজরত উমর (রা.)।

চারমাস অবরোধের পর জেরুজালেমের প্রধান ধর্ম যাজক সেফ্রোনিয়াস, খলিফা উমর (রা.) স্বয়ং জেরুজালেম উপিস্থিত হয়ে চুক্তিপত্রে সাক্ষর করলে জেরুজালেম মুসলমানদের হাতে অর্পিত হয়।
খলিফার মহানুভবতায় জেরুজালেম বাসী আত্মসমর্পন করে। তারা স্বাধীনভাবে ধর্মকার্জ সম্পাদনের অধিকারের জন্য এক সন্ধিপত্রে খলিফাকে দিয়ে সাক্ষর করিয়ে নেয়। 

১০৮৭ সালে পোপ তৃতীয় ভিক্টরের মৃত্যু হলে দ্বিতীয় উর্বান পোপ হন।

১০৯৫ সালে পূর্ব রোম সম্রাট এলেক্সিয়াস এর আহ্বানে খ্রীষ্টান সন্যাসী পিটারের পরামর্শে মুসলমানদের অধিকৃত পবিত্র শহর জেরুজালেম উদ্ধারের জন্য দক্ষিন ফ্রান্সের ক্লেয়মেন্ট নামক জায়গায় এক সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় পোপের মোটিভেশনাল বক্তৃতায় উত্তেজিত হয়ে ফ্রান্স, লরেন, ইটালী, সিসিলি থেকে প্রায় দেড় লক্ষ খ্রীষ্টান সেরুজালেম যাত্রা করে।
খ্রীষ্টান সন্যাসী পিটারের চল্লিশ হাজার ধর্মযোদ্ধা এশিয়া মাইনর আক্রমণ করলে প্রথম ক্রুসেড আরাম্ভ হয় (১০৯৬)।
এই সময়ে মুসলিম জগত অভ্যন্তরীন কোন্দলে জর্জরিত ছিলো। বাগদাদের সিংহাসন নিয়ে সেলজুকী সুলতান মালেক শাহের পুত্রদের এবং দামেশক ও আলেপ্পার আধিপত্য নিয়ে মালেক শাহের ভ্রাতুস্পুত্র রেজওয়ান ও দুদাকের মধ্যে বিবাদ চলছিলো। স্পেনের আরবরা পরস্পর গৃহযুদ্ধ ও প্রতিবেশী খ্রীষ্টানদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত। মিশরের খলিফা ছিলেন হীনবল এবং বিলাসিতার স্রোতে ভাসমান। সুতরাং এশিয়া মাইনর ও সিরিয়ার মুসলিম জনসাধারণ এই যুদ্ধে কোন সাহায্য পেল না।
ইকনিয়ামের সেলজুকী সৈন্যের আক্রমণে এবং রসদাদির অভাবে পিটারের পরিচালিত সমস্ত খ্রীষ্টান বাহিনী এশিয়া মাইনরে বিনষ্ট হয়। বলা হয়েছে, '‘They belived it to be unneccesary to take money or food, that God would supply His warriors.- All these perished on the way.’'
১০৯৭ সালে গডফ্রের নেতৃত্বে পরিচালিত সাত লক্ষ খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধা কন্সটান্টিনপোলের পথে এশিয়া মাইনর আক্রমণ করেন। ইকনিয়ামের সেলজুকী সুলতান কিলিজ আর্সালান দাউদ খ্রীষ্টান বাহীনির গতিরোধ করতে গিয়ে পরাজিত হন। খ্রীষ্টানগণ পথের মাঝে যে সমস্থ নগর ও গ্রামাদি পেয়েছে সমস্থ পুড়িয়ে ফেলে ও অধিবাসীদের হত্যা করে। যেহেতু যুদ্ধ, তাই হত্যা গুলো হয়েছে নির্দয় ভাবেই। এরপর খ্রীষ্টানগণ এন্টিয়ক নগর আবরোধ করে ২১ অক্টোবর।
নয় মাস অবরোধের পর খ্রীষ্টান ক্রুসেডারগণ এন্টিয়ক নগর অধিকার করে ১০৯৮ সালের ৩রা জুন। নগরের অধিবাসীদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা এবং ভক্ষন করে। কারন খ্রীষ্টান ধর্মজাজকগণ প্রচার করেছিলো যে, যারা মুসলমানের মাংশ ভক্ষন করবে তারা নিস্পাপ অবস্থায় স্ব্গে আরোহন করতে পারবে। খ্রীষ্টান দলপতি বোহিমন্ড এন্টিয়কের রাজা ঘোষিত হন।
জানুয়ারী, ১০৯৯ সালে ফরাসী কাউন্ট রেমন্ড এর নেতৃত্বে পরিচালিত খৃস্টান যোদ্ধাগণ সিরিয়ার মেরাতুন্নোমান নগর ভস্মিভূত ও এর এক লক্ষ অধিবাসীকে হত্যা করে।
ক্রুসেডার দলপতি গডফ্রে মিসরের ফাতেমিয় খলিফা মোস্তা আলী বিল্লার সেনাপতি ইফতেখার উদ্দৌলাকে পরাজিত করে জেরুজালেম নগর দখল করে। এবং সেখানকার প্রায় সত্তর হাজার অধিবাসিকে হত্যা করে।
গডফ্রে জেরুজালেমের রাজা বলে ঘোষিত হন। তার আদেশে জেরুজালেমের প্রসিদ্ধ মসজিদ (Mosque of Omar) গির্জায় পরিনত হয়। এ খবর শুনে বাগদাদের খলিফা মোস্তাজহের কোন মৌখিক সহনুভূতি প্রকাশ করলেন মাত্র। কিন্তু সেলজুকী সুলতান মদ্যপায়ী বর্কইয়ারুকের মুখে সহানুভূতির বাক্যও উচ্চারিত হল না।
জেরুজালেম পতনের সংবাদ শুনে মিশরের ফাতেমিয়া খলিফা পুনঃ একদল সৈন্য প্রেরণ করেন। কিন্তু ঐ সৈন্যদল আস্কালন নগরের কাছেই খ্রীষ্টানদের হাতে পরাজিত হয়।
খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধাগণ সিরিয়ার সুমদ্র উপকূলবর্তি হাইফা জাফ্‌ফা, কাইসারিইয়া, আক্কা, তারসুস প্রভৃতি নগর দখল পুর্বক নগরসমুহের মুসলমান ও ইহুদী আধিবাসীগণকে হত্যা করে। অন্যদিকে জেরুজালেমের রাজা গডফ্রের মৃত্যু হয়। তার ভাই বল্ডউইন রাজপদে অধিষ্ঠিত হন।
এন্টয়াক রাজ বোহিমন্ড সেলজুক সেনাপতি গোমিস্তিগিন কতৃক পরাজিত ও বন্দি হন। ক্রুসেডার দলপতি রেমন্ড সিরিয়ার ত্রিপোলী বন্দর অবরোধ করেন। অন্যদিকে বিভিন্ন দলপতির নেতৃত্বে পরিচালিত চার লক্ষাধিক খ্রীষ্টান যোদ্ধা এশিয়া মাইনরের আনাতোলিয়া প্রদেশে খাদ্যাভাব, মহামারী ও তুর্কি সৈন্যদের হাতে প্রাণ বিসর্জন করে। মিসরের ফাতেমিইয়া খলিফা মোস্তা আ’লীর মৃত্যু হয়। তার পাঁচ বছর বয়সী সন্তান আমীর বি-আহকামেল্লাহ্ রাজ্য লাভ করে ১১০১ সালে।
এ্যকুইটাইনের ডিউক উইলিয়াম সসৈন্য জেরুজালেমের পথে কন্সটান্টিনোপলের নিকট নহত হন।
বাগদাদের সেলজুকী সুলতান বর্কইয়ারুকের মৃত্যুর পরে তার ভাই মুহাম্মদ শাহ সিংহাসনে বসেন।
এর মধ্যে ১১০৯ সালের জুলাই মাসে অনেক সময় অবরোধের পর খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধাগণ সিরিয়ার ত্রিপোলী বন্দর অধিকার করে অধিবাসিদের হত্যা করে। খ্রীষ্টান ক্রুসেডারদের ত্রিপোলী ও আলেপ্পা নগর ধ্বংসের খবরে বাগদাদের খলিফা মোস্তাজহির বিল্লা জামে মসজিদে প্রার্থনা করেই চুপ থাকলেন। সেলজুকী সুলাতান মুহাম্মদ শাহও কিছু করা থেকে বিরত থাকেন। সেই শহরে বিশ্ব বিখ্যাত গ্রন্থাগার খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধারা পুড়িয়ে ফেলে। ঐ গ্রন্থাগারে ত্রিশ লক্ষ বই ছিলো। নগর দখলের পর রেমন্ডের আদেশে এই গ্রন্থাগারের কি গতি করা যায় এর সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কাউন্ট সেন্ট জিন্ নামক প্রবীন পাদ্রী গ্রন্থাগার পরিদর্শণ করেন। পাদ্রী মশায় প্রথম রুমে প্রবেশ করেন, সেখানে কুরানের অনুলিপি সাজানো ছিলো। তিনি ক্রমে বিশটি বই খুলে দেখেন সবগুলোই কুরান। তিনি তক্ষুনি ঘোষনা করলেন- এই গ্রন্থাগারের সমস্থ বই খ্রীষ্টধর্মের বিরুদ্ধে। তার আদেশে ঐ গ্রন্থাগার পুড়ানো হল।
মৌস্পল ও দামেশকের সেলজুকী শাসকর্তাদের দ্বারা খ্রীষ্টান ক্রুসেডারদণ তিবরিয়া হ্রদের তীরে পরাভূত হয় (১১১৩)।
এই সময়ের মাঝে পোপ ছিলেন জিলেসিয়াস, দ্বিতীয় কেলিটাস্, হনোরিয়াস, দ্বিতীয় ইনোসেন্ট, দ্বিতীয় চেলেস্টাইন।
খ্রীষ্টান ক্রুসেডাররা সিরিয়ার বিভিন্ন যুদ্ধে তুর্কিদের কাছে পরাজিত হয়। মুসলমানদের করুন পরিনতি দেখে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ তুমরাই নামক জৈনক তাপস পশ্চিম আফ্রিকায় নিজেকে প্রতিশ্রুত ইমাম মেহেদী বলে ঘোষনা করে। যাযাবর আরব বেদুইনরা তার সাথে যোগ দেয়।
এই যখন অবস্থা ১১৩৭ সালে ক্রুসেড বিজয়ী মহাবীর সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন ইবনে আইয়ূব ইরাক প্রদেশের তাকরিৎ নামক স্থানে জন্মগ্রহন করেন।
মৌসলের স্বাধীন আমীর আতাবুক ইমাদউদ্দিন জঙ্গী ক্রুসেডার ডিউক জসেলিনকে পরাজিত করে সিরিয়ার এডেসা দখল করেন।
জার্মান সম্রাট তৃতীয় কনরোড ও ফ্রান্সরাজ সপ্তম লুঁই  নেতৃত্বে নয় লক্ষ খ্রীষ্টান ক্রুসেডার সিরিয়া আক্রমন করে। ফরাসী রানী ইলিয়ানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে হজার হজার নারীও এই যুদ্ধে যোগ দেন। এই বিরাট বাহিনী সিরিয়ায় উপস্থিত হলে দ্বিতীয় ক্রুসেড আরাম্ভ হয় (১১৪৭ সাল)। খ্রীষ্টান ক্রুসেডারগণ এন্টিয়ক নগর পুনঃদখল করে।
আলেপ্পার আমীর নুরউদ্দিন জঙ্গী ও তার ভাই মৌসলপতি সয়ফউদ্দিন জঙ্গী ছাড়া অন্য কোন মুসলিম রাজশক্তি ঐ দুর্দিনে সিরিয়াবাসীর সাহায্যে আসে নাই। দামেস্ক নগরের নিকট ক্রুসেডারগণ জঙ্গী ভাতৃদ্বয়ের কাছে পরাজিত হয়। আলেপ্পা রাজ নুরউদ্দিন জঙ্গীর সাথে এডেসার ডিউক দ্বিতীয় জোসেলিনের বিবাদ শুরু হয়। নুরউদ্দিন জোসেলিনকে বন্দি করেন। জেরুজালেম রাজা তৃতীয় বল্ডউইন মিসরীয় বাহীনিকে পরাজিত করে ভুমধ্যসাগরের উপকূলবর্তি আস্কালন বন্দর দখল করেন (১১৫১-১১৫৩)।
১১৫৯ সালে মরক্কোর সুলতান আব্দুল মো’মেন খ্রীষ্টানদেরকে পরাভূত করে সমগ্র ত্রিপোলী স্বরাজ্যভুক্ত করেন।
আলেপ্পার আমীর নুরউদ্দিন জঙ্গী ক্রুসেডের খ্রীষ্টান যোদ্ধাগণকে হারিম শহরের নিকটবর্তি কোন এক স্থানে পরাজিত করেন। এই যুদ্ধে অধিকাংশ খ্রীষ্টান নেতা, এন্টিয়ক রাজা তৃতীয় বোহিমন্ড ও ত্রিপোলীর ডিউক তৃতীয় রেমন্ড নিহত অথবা বন্দি হন।


এবার একটু মিসরে দিকে আসি, কারণ ক্রুসেড যুদ্ধ বিজয়ের অন্যতম দাবিদার মিশর। খ্রীষ্টপূর্ব ৩১সালে মিসর রোম সম্রাজ্য ভুক্ত হওয়ার পর ৬১৮ সালে পারসিকরা মিসর আক্রমন করে, এবং মিসর দখল করে। যদিও ৬২২ ও ৬২৭ সালে রোমকরা আবার পারসিকদের কাছ থেকে মিসর পুণরুদ্ধান করে। ৬৪১ খ্রীষ্টাব্দে মুসলিম সেনাপতি যুবাইর ইবনে আওয়াম কতৃক আরবদের মিশর জয় হয়। পরবর্তিতে খলিফা শাসন ব্যবস্থা প্রধান প্রধান মুসলিম দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। যেমন উমাইয়া বংশীয় খলিফা শাসন, ফাতেমিয়া বংশীয় খলিফা শাসন, আব্বাসীয়া খলিফা শাসন ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে মিশরে ক্রুসেড চলাকালীন সময়ে ১২৬১ সালের আগ পর্যন্ত ফাতেমিয়া খলিফারা শাসন করত। তদানীন্তন ফাতেমিয়া খলিফাগণ প্রধান মন্ত্রীর হাতে রাজ্যভার আর্পন করে অন্তঃপুরে সময় কাটাত। রাজপ্রাসাদের নিকটবর্তি আল আজহার মসজিদে শুধু শুক্রবার উপস্থিত হয়ে জুম’আর নামাজ পরতেন। খলীফার প্রাসাদে চার হাজার কক্ষ ছিলো। ঐ সকল কক্ষগুলো স্বর্ণ, রৌপ, মণি-মাণিক্য খচিত দ্রব্যাদিতে পরিপূর্ণ ছিলো। খলিফার দাস-দাসী ও ভৃত্যগণের সংখ্যা আঠারো হাজার থেকে ত্রিশ হাজার ছিলো। ফলতঃ তখন প্রধান মন্ত্রীই ছিলেন রাজ্যের সর্বময় কর্তা। সতরাং রাজ্যে তো অরাজকতা বিরাজ করবেই।

১১৬৯ সালে মিসরের ফাতেমিয়া বংশীয় শেষ খলিফা আল আজিদের বিদ্রোহী সেনাপতি দিরগামকে দমন করতে অসমর্থ হলে প্রধান মন্ত্রি শাবের আল সা’দী আলেপ্পার-রাজ নুরুদ্দিনের সেনাপতি ‘শেরকুহ’ মিশরে উপস্থিত হন এবং বিলবেজ নামক স্থানে বিদ্রহী সেনাপতি দিরগামকে নিহত করেন। শাবের আলেপ্পো ফিরে যান। এদিকে মিসর-মন্ত্রী শাবের জেরুজালেমের খ্রীষ্টান রাজা এমালরিকের সঙ্গে নুরউদ্দিনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। নুরউদ্দিন এ কথা শুনে শেরকুহ ও তার ভাতিজা সালাহ্উদ্দিন ইবনে আইয়ূবকে মিশর আক্রমনে পাঠান। জেরুজালেম রাজ এমেলরিকও মন্ত্রীর সাহায্যার্থে মিশরে উপনীত হন। রাজধানী কায়রোর নিকটবর্তি বাবেইন নামক স্থানের যুদ্ধে মন্ত্রী শাবের ও জেরুজালেম রাজের সম্মিলিত সেনাদল পরাভূত হয়। মন্ত্রী শাবের নিহত হন। শেরকুহ রাজধানী কায়রো ও সালাউদ্দিন অ্যালেক্সজেন্ড্রা বন্দর অধিকার করেন। ফাতেমিয়া খলিফা আল আজিদ শেরকুহকে মন্ত্রীপদে নিযুক্ত করেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যেই শেরকুহর মৃত্যু হলে সালাহ্‌উদ্দিন মিসরের মন্ত্রীত্ব লাভ করেন। এরই মধ্যে আল্ আজিদ দিনিল্লার মৃত্যু হয় ১১৭১ সালে। প্রধান মন্ত্রী মৃত খলিফার পরিবারবর্গকে প্রচুর বৃত্তি প্রদান করে স্বয়ং সিংহাসনে আরোহন করেন। ইনিই সুলাতান সালহ্‌উদ্দিন। এর পর থেকে যা যা ঘটতে থাকে তাকে ক্রুসেড ড্রামার ইন্টারভাল বলা চলে।
১১৭১ সালে সালাহ্‌উদ্দিনের সুলতান হবার পর কতিপয় মিশরিয় নেতার আহ্বানে সিসিলির নর্মান রাজ দ্বিতীয় উইলিয়াম ছয়’শ যুদ্ধজাহাজ ও ত্রিশ হাজার সৈন্যসহ মিশরের অ্যালেক্সজান্ড্রিয়া বন্দর আক্রমন করেন। সালাহ্‌উদ্দিন অবিলম্বে বিদ্রোহী নায়কগণকে ধৃত ও হত্যা করেন এবং সিসিলি রাজ্যের সম্মুখীন হন। যুদ্ধে পরাজিত হয়ে উইলিয়াম স্বরাজ্যে প্রত্যাবর্তন করেন।
এর কয়েক বছর পরে, প্রায় ১১৭৬ সালে সিরিয়ার বালক সুলতান মালেকু শাহ ইসমাইল মন্ত্রী গুমস্তাগীনের পরামর্শে দামেশক থেকে আলেপ্পোয় রাজধানী স্থানাতরিত করেন। এই সুযোগে পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী খ্রীষ্টান ক্রুসেডাররা দামেশক নগর অবরোধ করে। এই খবর শুনে সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন মাত্র সাত’শ সৈন্য নিয়ে দামেশক উপস্থিত হন। খ্রীষ্টান ক্রুসেডাররা সালাহ্‌উদ্দিনের সাথে বিবাদে না জরিয়ে অবোরধ প্রত্যাহার করে। অপর দিকে সিরিয়ার মন্ত্রী দেখলেন তার উদ্দেশ্য চিরতার্থ হচ্ছে না। তিনি মৌসল অধিপতি সায়েফউদ্দিন জঙ্গীর ভাতিজা মালেকু সালেহের পক্ষ দামেশক আক্রমন করলে সালাহ্‌উদ্দিনের সাথে যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে সালাহ্‌উদ্দিন জয়লাভ করেন। তিনি সিরিয়ার তখ্‌তে ভাই তুরান শাহকে শাসন-কতৃত্ব প্রদান করে মিশরে ফিরে আসেন।
ইসমাইলী বাতেনী সম্প্রদায়ের জৈনক ব্যাক্তি সুলতান সালাহ্‌উদ্দিনকে হত্যা করার চেষ্টা করে এবং ব্যার্থ হয়। এজন্য সুলতান বাতেনী সম্পরদায়ের বিখ্যাত দলপতি রশিদ উদ্দিন সিনান ‘শেখল জবল’-এর বাসস্থান মাসইয়াদ আবরোধ করেন। শেখল জবল উপায়ন্তুর না দেখে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং শান্তি রক্ষা করে থাকার প্রতিজ্ঞা করেন। 


প্রতি শতাব্দীতে একজন করে বীর দেখার সৌভাগ্য হয় পৃথিবীর মানুষদের। বারো ও তেরোশ শতাব্দীতে চারজন বীর দেখতে পেয়েছিলো পৃথিবীবাসী এক এই সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন, অপর তিনজনের একজন সিংহ হৃদয় সম্রাট রিচার্ড, বিশ্ব-ত্রাশ চেঙ্গিস, আর গরিবের বন্ধু রবিন হুড। শেষের দুজন আমাদের ক্রুসেড প্রসঙ্গের ভেতরে পড়েন না।
১১৭৭ সালে সুলতান সাল্লহ্‌উদ্দিন প্যালেস্টাইনের মার্জিয়ান নামক স্থানের যুদ্ধে ক্রুসেডার খ্রীষ্টানগণকে পরাজিত করেন। এর পরপরই সুলতান সালহ্‌উদ্দিনের আহ্বানে সান্‌জা নদীর তীরে পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম রাজন্যবর্গের এক সম্নেলন অনুষ্ঠিত হয়। ইকনিয়াম, আর্মেনি, মৌসল, জর্জিয়া, আরবাল, কায়ফা মার্দিন প্রভৃতি স্থানের নরপতিরা ঐ সন্মেলনে উপস্থিত হয়ে (২রা অক্টোবর, ১১৮০সাল), দুই বছর পর্যন্ত পরস্পর বিবাদ থেকে নিবৃত্ত থাকার প্রতিশ্রুত হন।
খ্রীষ্টান ক্রুসেডারদের সঙ্গে যুদ্ধে মসৌল বাদশাহ আতাবুক সয়েফউদ্দিন নিহত হন। তার ভাই আয়েজউদ্দিন মসুদ মসৌলের রাজপদে অধিষ্ঠত হন। আলেপ্পো-রাজ মালেক সালেহ ইসমাঈলের মৃত্যু হলে (ডিসেম্বর, ১১৮১ সাল) তার অন্তিম ইচ্ছানুসারে তার পিতৃব্য পুত্র মৌসলপতি আয়েজউদ্দিন মসউদ আলেপ্পো রাজ্যলাভ করেন। আয়েজদ্দিন মসউদ সুলতান সালাহ্‌উদ্দিনের বিরুদ্ধবাদী হন।
পশ্চিম এশিয়ার মুসলিম রাজ্যবর্গের সন্মেলনের দুই বছর পর সুলতান সালহ্‌উদ্দিন আরব,সিরিয়া, মিশর ও নিউবিয়ার স্বাধীন সুলতান বলে ঘোষিত হন। ওদিকে প্যালাস্টাইনের খ্রীষ্টান ক্রুসেডারগণ পূর্ব সন্ধি লঙ্ঘন করায় সুলতান সালহ্‌উদ্দিন মিসর থেকে সিরিয়া উপস্থিত হন। এই যুদ্ধে তার ভায়ের ছেলে ফররুখ শাহ তাকে সাহায্য করেন। তাদের সন্মিলিত যুদ্ধে খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধানগণ পরাজিত হয়। এরপর সুলতান সাল্লহ্উদ্দিন ইরাকের ইর্ষাপরায়ণ মুসলিম নেতাগণদের দমন করার জন্যে অগ্রসর হন। ক্রমেই তিনি এডেসা, রাক্কা, কারকিসিয়া, নসিবিন প্রভৃতি শহর অধিকার করেন এবং সবশেষে তিনি মৌসল অবরোধ করেন ১১৮২ খ্রীষ্টাব্দে। মৌসলরাজ আয়েজউদ্দিন মসউদ আলেপ্পো শহর সুলতানকে প্রদান করে সন্ধি স্থাপন করেন।
ক্রুসেডার খ্রীষ্টান সেনাপতি রেজিনাল্ড সুয়েজের দক্ষিনে অবস্থিত আকাবা উপসাগরের তীরবর্তি আইলা বন্দর অবরোধ করে সেখানে আরব-বণিকদের বারোটি জাহাজ লুটপাট করার পর পুড়িয়ে ফেলে এবং আরব বণিকদের হত্যা করে। অতঃপর রেজিনাল্ড মদীনায় অবস্থিত হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর সমাধি উৎখাত করতে মদিনা যাত্রা করেন।
সুলতান সালাহ্‌উদ্দিনের নৌ সেনাপতি এই সংবাদ শুনে অবিলম্বে হেজায যাত্রা করেন। লোহিত সাগরের তীরবর্তী রাবেগ বন্দরের নিকটবর্তী পার্বত্য পথে ১১৮৪ সালে মিসরীয় বাহিনী ক্রুসেডার খ্রীষ্টানদের গতিরোধ করে। রেজিনাল্ড পরাজিত হয়ে প্যালেস্টাইনে পালিয়ে যান। অধিকাংশ সৈন্য নিহত অথবা বন্দিভাবে মিসরে আনিত হয়। সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন প্রতিজ্ঞা করেন স্বহস্তে তিনি রেজিনাল্ডকে হত্যা করবেন।
সুলতান সালহ্‌উদ্দিন আশি হাজার আশ্বারোহী সৈন্যসহ তিবরিয়া হৃদের তীরবর্তী হিত্তিন প্রান্তরে খ্রীষ্টান ক্রুসেডারদের সাথে যুদ্ধ করেন এবং যুদ্ধে জয় লাভ করেন (৩-৪ঠা জুলাই, ১১৮৭ খ্রীষ্টাব্দ)। এই যুদ্ধে ত্রিশ হাজার খ্রীষ্টানযোদ্ধা নিহত হয় এবনহ জেরুজালেমের রাজা গুই রেজিনাল্ড ও অন্যান্য প্রধান প্রধান খ্রীষ্টান সেনানায়করা সুলতানের হাতে বন্দী হয়। সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন পূর্ব প্রতিজ্ঞানুযায়ী রেজিনাল্ডকে হত্যা করেন। সুলতানের বিজয়ী সেনাদল ক্রমে আক্কা, নাজারেথ, হাইফা, সিজারিয়া, জাফ্‌ফা, সিডন, বৈরুত প্রভৃতি নগর অধিকার করে। সুলতান স্বয়ং জেরুজালেম আবরোধ করেন (২৩ সেপ্টেম্বর, ১১৮৭ খ্রীষ্টাব্দ) কয়েকদিন পরেই নগরবাসী সুলতানের কাছে আত্নসমর্পন করে (২রা অক্টোবর, ১১৮৭ খ্রিষ্টাব্দ)।
Kingdom of Heaven চলচিত্রটিতে যে কাহীনি উপস্থাপন করা হয়েছে তা মনগড়া মাত্র। আসলে খ্রীষ্টানগন কোন প্রতিরোধই গঠন করতে পারে নাই। সুলতানের সমস্ত মহানুভবতা কল্পিত নায়কের গলায় দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। সুলতানের আদেশে প্রত্যেক খ্রীষ্টান দশ হাজার স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করে স্ব-স্ব ধনসম্পদসহ নগর পরিত্যাগের অনুমতি লাভ করে। মুক্তিপণ প্রদানের সময়ে দুইজন স্ত্রীলোক ও দশজন শিশু একজন পুরুষ সমান বিবেচিত হয়েছিল। চল্লিশ দিন পর্যন্ত খ্রীষ্টানরা এইভাবে মুক্তিপণ দিয়ে অন্যত্র প্রস্থান করতে থাকে। খ্রীষ্টানদের শহর পরিত্যাগের পর সুলতান সাল্লহ্‌উদ্দিন মহাসমারহে জেরুজালেম শহরে প্রবেশ করেন(২৭শে রজব, ৫৮৩ হিজরি)।
অপর ইংল্যান্ড সম্রাট দ্বিতীয় হেনেরীর মৃত্যু হয়। তার ছেলে সিংহ হৃদয় রিচার্ড সিংহাসনে আরোহণ করেন ১১৮৯ খ্রীষ্টাব্দে। সম্রাট রিচার্ডের আদেশে ক্রুসেড যুদ্ধের ব্যায় স্বরূপ প্রত্যেক ইংল্যান্ড বাসীর আয়ের দশমাংশ ‘Saladin Tax’ নামে সংগ্রহীত হত।
এই সময়ে পবিত্র ভূমি জেরুজালেমের পতন ও সিরিয়া-প্যালেস্টাইনে খ্রিষ্টানদের শোচনীয় পরাজয়-বার্তা শুনে ইংল্যান্ড রাজ রিচার্ড, ফরাসী-সম্রাট দ্বিতীয় ফিলিপ্‌স ও জার্মান রাজ ফ্রেডারিক বার্বারোসা অগনিত সৈন্যসহ জেরুজালেম উদ্ধারার্থে যাত্রা করেন। পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও ঘৃনিত তৃতীয় ক্রুসেড শুরু হয়।
খ্রীষ্টান ধর্মযোদ্ধাগণ দলে দলে সিরিয়ার সুমদ্রকূলবর্তী টায়র ও আক্কা নগরে সমবত হতে থাকে। এই যোদ্ধাদের ভেতরে বহু যুবতি সৈনিক বেশে সিরিয়ায় আগমন করেছিল। তাদের শিবিরে পুরুষ ও নারী সৈন্যরা একত্রে সমাবেশে ব্যাভিচার স্রোত অবাধে চলতে লাগলো। ইংল্যান্ডের আর্চবিশপ বল্ডউইন ঐ বিভৎস ব্যাভিচার ও মদপানের প্রাবল্য দেখে হতাশ হলেন এবং এক রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ভবের মায়া ত্যাগ করলেন।
সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন স্বয়ং আক্কা নগর আক্রমন করেন (২৭শে আগস্ট, ১১৮৯) 

ভীষন যুদ্ধে খ্রীষ্টানরা পরাজিত হয় সেই বছরের ৪ সেপ্টেম্বর। এই যুদ্ধে ৪ হাজার খ্রীষ্টান ক্রুসেডার নিহত হয়। এই সময় সম্রাট রিচার্ড ও ফিলিপ সসৈন্য আক্কার নিকটবর্তি হলে খ্রীষ্টান ক্রুসেডাররা বিপুল উৎসাহে পুনঃ আক্কা অবোরধ করে।

জার্মান রাজ ফ্রেডারিক নিজ সৈন্যসহ ঈজিয়ান সাগরে সলিল সমাধি হন। সিরিয়ার বিভিন্ন যুদ্ধে খ্রীষ্টানরা বার-বার পরাজিত হতে থাকলেও ইউরোপ থেকে নতুন নতুন যোদ্ধা সিরিয়ায় আসতে থাকলে ক্রুসেডারদের সাহস ও উৎসাহ বাড়তে থাকে। দুই বছর আক্কা শহরের অবরোধ ধরে রাখার পর সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন পিছু হটতে থাকেন। এরই মধ্যে সম্রাট রিচার্ড আক্কা উপস্থিত হন।
১১৯১ সালে আক্কা নগর বাসী নিরুপায় হয়ে আত্মসমর্পণ করে। সিংহ হৃদয় রিচার্ড প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে নগরের সাতাশ হাজার ইহুদী ও মুসলমান নাগরিকদের হত্যা করে খ্রীষ্ট ধর্মের আদর্শ প্রদর্শন করেন। আক্কা আবরোধের সময় দুই বছর বছরের খন্ড যুদ্ধে খ্রীষ্টানপক্ষের প্রায় এক লক্ষ সৈন্য নিহত হয়েছিলো। ধর্মোৎসাহের আগুন এমন প্রচন্ডভাবে আর কোথাও জ্বলে উঠে নাই। মোট কথা এই ক্ষুদ্র স্থানে ইউরোপ ও এশিয়ার সমস্ত শক্তি প্রায় ক্ষয়ে গিয়েছিলো।
এই সময়ে সম্রাট রিচার্ড ও ফ্রান্স রাজ ফিলিপের মধ্যে মনোমানিল্য সৃষ্টি হয় এবং ফিলিপ স্বসৈন্য ফ্রান্স যাত্রা করেন। কিছুদিন পর সম্রাট রিচার্ড খবর পান ফিলিপ রিচার্ডের ভাই জনকে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে বসানোর পায়তারা করছে। সম্রাট রিচার্ড দেশে দেশে ফিরে যাবার চিন্তা করতে থাকলেন, ফলে সুলতান সালহ্‌উদ্দিনের সাথে তার সন্ধি করা একান্ত জরুরী হয়ে পড়লো। কিন্তু সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন সন্ধী প্রস্তাবকে সন্তর্পনে পাশ কাটিয়ে গেলেন। কিন্তু সম্রাট রিচার্ডকে সিংহাসন বাঁচান আতি জরুরী হয়ে পরেছিলো কারন তিনি যদি রাজ সিংহাসন হারান তবে তাকে চিরকাল এই এশিয়া মাইনরে পড়ে থাকতে হবে। যা কোন মানুষের জন্য কখনই কাম্য নয়। শেষ পর্যন্ত সুলতান সালাহ্‌উদ্দিন সন্ধি করতে রাজি হন। কিন্তু সন্ধি সম্রাট রিচার্ডের মনপুত না তাই তিনি জেরুজালেম আক্রমনের সিদ্ধান্ত নেন। অপরদিকে যখন তিনি আক্কা জয় করেন তখন খ্রীষ্টান বাহিনীতে তিন লক্ষ সৈন্য ছিলো। তিনি উপকূল পথে জেরুজালেম যাত্রা করতে চাইলে মাত্র এক লক্ষ খ্রীষ্টান সৈন্য তার সাথে আসে। কারন খ্রীষ্টান ক্রুসেডারদের ব্যাভিচারের ঘটনা তার কানে গেলে তিনি আদেশ করেন ধোপিনী ছাড়া কোন স্ত্রীলোক সৈন্যদের সঙ্গে যেতে পারবে না। এতে অধিকাংশ খ্রীষ্টান যোদ্ধা নিরুৎসাহিত হয়ে রিচার্ডের শিবির ত্যাগ করে।
সম্রাট রিচার্ড ১১৯২ খ্রীষ্টাব্দে সিরিয়ার সিরিয়ার উপকূলবর্তী জাফ্‌ফা বন্দর অবরোধ করেন। যুদ্ধ স্থগিত করে রিচার্ড ইংল্যান্ড প্রত্যাবর্তনের জন্য সুলতান সালহ্‌উদ্দিনকে বার বার প্রস্তাব করেও অকৃতকার্য হন। ইতোমধ্যে সম্রাট রিচার্ড আসুস্থ হয়ে শয্যাগত হন। রিচার্ডের কাতর সংবাদ শুনে সুলতান যুদ্ধ স্থগিত রাখেন এবং তার চিকিৎসার জন্য এক প্রবীন চিকিৎসক ও পথ্যের জন্য নানাবিধ উপাদেয় ফল ও বরফ প্রেরণ করেন। 

রিচার্ড সুস্থ হলে সুলতান সালাহ্উদ্দিন ও সম্রাট রিচার্ড সন্ধি প্রস্তাবে বসার জন্য একে অপরকে আহ্বান করেন। এই দুই বান্দার কি ভীমরতি ধরলো কে জানে সন্ধিতে দুজনে বসে রিচার্ডের বোন জোয়ানের (Joan) সাথে সালাহ্‌উদ্দিনের ভাই মালেকুল আব্দুল সয়েফউদ্দিনের বিয়ে প্রদানের সিদ্ধান্ত নেন। এবং রিচার্ডের প্রস্তাবনুসারে জেরুজালেম নগর নব-দম্পতিকে বিয়ের উপহার স্বরূপ প্রদান করা হল।
উইকিপিডিয়া থেকে বিস্তারিত তুলে দেওয়া হলঃ 
(The Third Crusade (1189–1192), also known as the Kings' Crusade, was an attempt by European leaders to reconquer the Holy Land from Saladin (Salāh ad-Dīn Yūsuf ibn Ayyūb). It was partially successful, but fell short of its ultimate goal—the reconquest of Jerusalem. 
After the failure of the Second Crusade, the Zengid dynasty controlled a unified Syria and engaged in a conflict with the Fatimid rulers of Egypt, which ultimately resulted in the unification of Egyptian and Syrian forces under the command of Saladin, who employed them to reduce the Christian states and to recapture Jerusalem in 1187. )

আজকে মুসলমানেরা অনেক পিছিয়ে আছে; আরব, পার্সিয়ান, তুর্কি জাতি এখনো ইসলামের নামে অনেক পশ্চাৎপদ প্রথা চালু রেখেছে স্বীকার করি। কিন্তু তীব্র আপত্তি জানাই, যখন বলা হয় ১৪০০ বছর পূর্বে আরব এবং মুসলমানেরা ছিল অসভ্য, বর্বর। রাগ উঠে যখন নাস্তিক হনুগুলো মহানবীর দেখানো পথকে অশান্তিময় বলে আখ্যা দেয়। মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারের সময় দু’এক জায়গায় বিশৃঙ্খলা, হত্যাযজ্ঞ হয়েছে কিন্তু তা কখনোই হনুদের পশ্চিমা প্রভুদের মতো এতো বর্বর ছিলনা। বরং সুযোগ্য মুসলিম শাসকেরাই সকল বিভেদ ভুলিয়ে সংঘাতময় স্থানকে সকলের জন্য শান্তিময় করে তুলেছে; যার প্রমাণ স্পেন, জেরুজালেম, ভারতবর্ষ।
মুসলমানেরা কখনো মৃতদের মাংস খায়নি, ইহুদীদেরও কোন হলোকাস্ট উপহার দেয়নি। ইহুদীদের সাথে মুসলমানদের দ্বন্দ্ব সেই প্রথম ক্রুসেড পরবর্তী রোমান ক্যাথোলিকদের সুদীর্ঘ চক্রান্তের ফসল। আজকে খ্রিস্টান-ইহুদীরা একজোট হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে একের পর এক অপপ্রচার চালাচ্ছে। আর অজ্ঞতা এবং আবেগের বশবর্তী হয়ে মুসলমানেরা সেই ফাঁদে পা দিয়ে ঘটাচ্ছে লিবিয়ার মত ঘটনা।
Comment