যুক্তরাষ্ট্র শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে সমগ্র পৃথিবীতে যুদ্ধের আগুন সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ১৪৮ টি যুদ্ধের মধ্যে ১৪১ টি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে।শত হলেও বিশ্বের মোড়ল, তাই কেউই তেমন উচ্চবাচ্য করতে পারেনা।আর মিডিয়ার কাজ হল ঢোলের বাদ্য বাজানো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে বিশ্ব মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব তেমন একটা ছিল না। তাই শুরু করছি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ
৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১ সালের ভোরে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌ-ঘাঁটিতে আক্রমণ পরিচালিত করে জাপান।জাপান পরিচালিত এ বিমান আক্রমণে ১৮৮টি মার্কিন বিমান ধ্বংস হয়। নিহত হয় ২,৪০২ জন এবং আহত বা ঘায়েল হয় ১,২৮২ জন। ফলে মহাযুদ্ধে অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র । এই আক্রমণ ছিল অনেকটা ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগানোর মত। পরবর্তীতে জাপান যার ফলাফল ভোগ করেছে। ৮ই মে ১৯৪৫ সালে জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে আত্নসমর্পণ করে। তখন যুদ্ধ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্ত, ৬ ই আগস্ট এবং ৯ ই আগস্ট যথাক্রমে জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমানবিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ।
আর এই হামলাটি চালানো হয় জার্মানির আত্নসমর্পণের প্রায় তিন মাস পরে।কতটুকু দরকার ছিল এই বোমা হামলার? এই বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক মারা যান।নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২১৪,০০০ জন।জাপানের আসাহি শিমবুন-এর করা হিসাব অনুযায়ী বোমার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগসমূহের ওপর হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য গণনায় ধরে হিরোশিমায় ২৩৭,০০০ এবং নাগাসাকিতে ১৩৫,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে। দুই শহরেই মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ।
উপরের ছবিটি হিরোশিমায় বোমা হামলার পরে তোলা।বড় ভাই ছোট ভাইয়ের লাশ নিয়ে যাচ্ছে কবর দেওয়ার জন্য।
জাপানের আত্মসমর্পণের পেছনে এই বোমাবর্ষণের ভূমিকা এবং এর প্রতিক্রিয়া ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অধিকাংশের ধারণা এই বোমাবর্ষণের ফলে যুদ্ধ অনেক মাস আগেই সমাপ্ত হয়, যার ফলে পূর্ব-পরিকল্পিত জাপান আক্রমণ (invasion) সংঘটিত হলে উভয় পক্ষের যে বিপুল প্রাণহানি হত, তা আর বাস্তবে ঘটেনি।অন্যদিকে জাপানের সাধারণ জনগণ মনে করে এই বোমাবর্ষণ অপ্রয়োজনীয় ছিল, কেননা জাপানের বেসামরিক নেতৃত্ব যুদ্ধ থামানোর জন্য গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল।
এমন নয় যে পারমানবিক বোমার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানত না।আর এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী মনোভাব ফুটে উঠে।
অবশেষে বিপুল পরিমাণে ক্ষতির মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল। তার মানে এই নয় যে যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ করা শেষ হয়েছে।এমন নয় যে, পারমানবিক বোমার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানত না।তাই এই হামলার কারনে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী মনোভাব ফুটে উঠে। জার্মানির কারনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হলেও যুক্তরাষ্ট্রেরও ধ্বংসলীলা ভোলার নয়।
আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯৪৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হল শীতল যুদ্ধ (Cold War).
শীতল যুদ্ধ (Cold War):
শীতল যুদ্ধ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র সমূহ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার টানাপোড়নের নাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক দেশ।এর পক্ষে থাকে চীন,কিউবা।এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ছিল যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশগুলো। যা ১৯৪৭ সাল থকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। অর্থাৎ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে শেষ হয় শীতল যুদ্ধ। ১৯৯১ সালে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানের মত দেশগুলোর জন্ম হয়।আর এর পেছনে হাত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশে বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনী তৈরীতে সহায়তা করেছিল। বলা হয়ে থাকে আল-কায়দা সহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মার্কিনীদের থেকেই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত । যারা পরবর্তীতে কালসাপে রূপান্তরিত হয়েছে।শীতল যুদ্ধ শেষ হয়েও শেষ হয়নি। এখনও রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পর বিরোধী কাজকর্ম অব্যাহত রয়েছে। মাঝে মাঝেই এই দুই দেশের মধ্যে আটককৃত গুপ্তচর বিনিময় ঘটে।
বলা বাহুল্য যে, যুদ্ধ করা এবং যুদ্ধ লাগানোতে মার্কিনীদের স্বার্থ আছে।অন্যতম কারন হল, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গুলোকে লুটেপুটে খাওয়া যায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য অস্ত্র বাণিজ্য অন্যতম ভূমিকা পালন করে। যদি যুদ্ধ নাই লাগে তাহলে অস্ত্র বিক্রি হবে কি করে? পৃথিবীতে অস্ত্র বাণিজ্যে শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র।যদিও এই নিউজটি কোন সংবাদ মাধ্যমের নয় তবুও লিখলামঃ ইউএন এর এক সামরিক কর্মকর্তার বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিনীদের এই অস্ত্র বাণিজ্যকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে মাফিয়াও নিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারন ও ধরন নিয়ে নির্মিত হয়েছে "Dirty Wars: The World is a battlefield" নামক তথ্যচিত্রটি। লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=O7UCFSbduuY
১৯৭২ সালে ভিয়েতনামে তোলা উপরের ছবিটি মনে করিয়ে দেয় সেদিন পৃথিবী কেঁদেছিল।
জাপানের আত্ন-সমর্পণের পর থেকে নতুন নতুন কাহিনী যুক্ত হতে থাকে ইতিহাসের পাতায়। যার মধ্যে কোরীয় যুদ্ধ অন্যতম। আর এই যুদ্ধকে শীতল যুদ্ধের (Cold War) অংশ মনে করা হয়।
কোরীয় যুদ্ধঃ
১৯১০ সাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জাপানী সাম্রাজ্য কোরীয় উপদ্বীপ শাসন করে। আর জাপানের পরাজয়ের পর, মিত্রশক্তিরা কোরীয় উপদ্বীপটিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। মার্কিন প্রশাসন উপদ্বীপটিকে ৩৮তম সমান্তরাল রেখায় ভাগ করে, এর মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী দক্ষিণ অর্ধেক নিজেদের দখলে আনে এবং সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনী উত্তর অর্ধেক অধিকারে আনে।একপাশে মার্কিনীদের সহায়তায় গড়ে উঠে ডানপন্থী সরকার। আর অন্যপাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় গঠিত হয় সাম্যবাদী সরকার। যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক ভাগের সৃষ্টি হয়। ফলে একসময় দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বার বার আলোচনা ভেস্তে যায়। অবশেষে সময়কাল ১৯৫০ সালের ২৫ শে জুন উত্তর কোরিয়া দক্ষিন কোরিয়া আক্রমন করে।রাশিয়া জাতিসংঘের অধিবেশন ত্যাগ করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের কাছ থেকে কোরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের অনুমোদন পাশ করায়। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিন কোরিয়ার হয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ে। যাইহোক, কাজে অথবা অকাজে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করবেই।যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে করেছিল শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য।যার ফলে যুদ্ধ মঞ্চে প্রবেশ করে চীন। রাশিয়া রসদ দিয়ে সাহায্য করে। আর কোরীয় যুদ্ধ মারাত্নক রূপ নেয়। সবদিকে যেন লাশের মিছিল।
এই শিশুগুলো কেন ভুক্তভুগি বলতে পারেন। ওরা যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্রাজ্যবাদী লড়াইয়ের আগুনের শিকার। সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কথা বাদই দিলাম। এই যুদ্ধে হতাহত হয় প্রায় পঁচিশ লক্ষ বেসামরিক মানুষ। এর জবাব কে দেবে?প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সৈন্য নিখোঁজ হয়। তাদের কবর হয়ত উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
অবশেষে, প্রায় তিন বছর পর, দুই কোরীয়ার মধ্যে যুদ্ধ বিরিতি সাক্ষর হয়। অনেকটা সংক্ষেপিত ভাবে শেষ করলাম কোরীয় যুদ্ধের ইতিকথা। যুদ্ধ যেন শেষ হয় না। সবাই তো আর মার্কিনীদের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে যুদ্ধে নামতে পারে না। আনেকে তো শোষিত হচ্ছে তো হচ্ছেই। যাই হোক, চলে যাই ভিয়েতনাম যুদ্ধে। ১৯৫৯ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সংঘঠিত হয়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধঃ
ভিয়েতনামের সাধারন মানুষের যেন আর মুক্তি নেই। দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ শেষে ভিয়েতনামীরা ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে।এরপর ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম - এই দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়।উত্তর ভিয়েতনামে সাম্যবাদী সরকার গঠিত হয় এবং দক্ষিন ভিয়েতনামে সাম্যবাদ বিরোধীরা ডানপন্থী সরকার গঠন করে।ডানপন্থী সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করে। আর সাম্যবাদীরা চেয়েছিল সমগ্র ভিয়েতনামে একক সাম্যবাদী সরকার গঠন করতে। আবার আম্রিকা। যুক্তরাষ্ট্রের মদদ পুষ্ট দক্ষিন ভিয়েত্নামের সরকার নিপীড়নমূলক আচরণ শুরু করে। আর এই নিপীড়নমূলক আচরণের প্রতিবাদে দক্ষিণ ভিয়েতনামে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করা হয়।১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। মার্কিনীদের জড়িয়ে পরার কারন কী জানেন? মার্কিনীদের "ডমিনো তত্ত্ব" ।ওদের এই তত্ত্বগুলোই সমগ্র বিশ্বে আগুন লাগানোর জন্য যথেষ্ট। এসব বিষয়ে পরে আলোচনা করব। চলে যাই যুদ্ধে।ধরতে গেলে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল, এই ব্যপক সময় নিয়ে চলে ভিয়েতনামের যুদ্ধ। শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে প্যারিসে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে বেশ কিছু বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একটির পর একটি ভেস্তে যায়। একদিকে সামরিক বাহিনী অন্য দিকে সাধারন জনগণ । এই যুদ্ধ যেন থামার নয়।তবুও, ২৩ জানুয়ারি, ১৯৭৩ সালে প্যারিসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু, কিছুদিন পর উভয় পক্ষই চুক্তি ভঙ্গ করে। আবারও, রক্তপাত। ভুক্তভুগী সাধারন মানুষ। তৎকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার আলোচনা চালাতে থাকেন। অবশেষে, ১৩ জুন, ১৯৭৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর ভিয়েতনাম যৌথভাবে প্যারিস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষর করে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সাম্যবাদী শাসনের অধীনে দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হয়। ১৯৭৬ সালে এটি সরকারীভাবে ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নাম ধারণ করে। এই যুদ্ধে প্রায় ৩২ লক্ষ ভিয়েতনামি মারা যান। এর সাথে আরও প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ লাও ও ক্যাম্বোডীয় জাতির লোক মারা যান। মার্কিনীদের প্রায় ৫৮ হাজার সেনা নিহত হন।যুদ্ধ যেন মৃত্যুর দূত হয়ে আসে।
ইরাক যুদ্ধঃ
মানুষের মানবিক গুণাবলী নষ্ট হওয়ার সীমাকে যে অতিক্রম করা যায়, যুক্তরাষ্ট্র তার সাক্ষী।একটি দেশ যে মিথ্যার আশ্রয় কত আয়োজন করে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রমাণ। ২০০৩ সালের ২০শে মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত বাহিনীর ইরাক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।ইরাক আক্রমণ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও কোয়ালিশন বাহিনী যে কারণ দেখিয়েছিল তা হল: ইরাক ১৯৯১ সালের চুক্তি অমান্য করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ করছে এবং তাদের কাছে এ ধরণের অস্ত্রের মজুদও আছে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিল, ইরাক যুক্তরাষ্ট্র, এর জনগণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় ধরণের হুমকি। পরবর্তীতে এএ সমর্থক কর্মকর্তাদের প্রচণ্ড সমালোচনা করা হয়। কারণ আগ্রাসনের পরে পরিদর্শকরা ইরাকে গিয়ে কোন ধরণের গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি। তারা জানায়, ইরাক ১৯৯১ সালেই গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ ত্যাগ করেছে, ইরাকের উপর থেকে আন্তর্জাতিক অনুমোদন সরিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তাদের নতুন করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের কোন পরিকল্পনাও ছিল না।এর দ্বারা যা প্রমানিত হয় তা কার কষ্ট বলার দরকার নেই।
যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্ররা ইরাক আক্রমণ করার পরপরই ইরাকী রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন পালিয়ে বেড়ায়।অবশেষে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তাকে আটক করা হয় এবং ২০০৬ এর ডিসেম্বরে সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এরপর সুন্নি এবং শিয়া দলগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং আল-কায়েদা ইরাকে তাদের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে। এই যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ১৫০,০০০ থেকে ১০ লক্ষের বেশী।মানুষ যেন আর মানুষ থাকে না।
আফগানিস্থান যুদ্ধঃ
যুদ্ধের আগে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আফগানিস্থানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালই ছিল।যুদ্ধ আফগানিস্থানকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
আফগানিস্থান যুদ্ধ শুরু ১৯৭৯ সালে “ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক্স” (USSR) এর সামরিক বাহিনী এবং আফগানিস্তানের কম্যুনিস্ট-বিরোধী গেরিলাদের মধ্যে।মুক্তির আন্দোলন হিসেবে যুদ্ধ শুরু হলেও পরবর্তীতে এই যুদ্ধ আফগানিস্থানকে খাদে ফেলে দেয়।যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি করা জঙ্গীরা দেশটিকে যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছে। এখন নাকি মার্কিনীরাই আফগান সরকারকে সহায়তা করছে জঙ্গীদের থেকে বাঁচতে।এ যেন হাস্যকর ব্যাপার।
বর্তমান সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে না বললেই নয়। আরব বসন্ত শুরু হয়েছে শত মানুষের রক্তপাত ঘটিয়ে। হোসনি মোবারকের পতন, গাদ্দাফীর হত্যাকাণ্ড যার সাথে সিরিয়ার ক্ষুধার্ত শিশুরা চিৎকার করে উঠে। এদিকে জার্মানির বিরোধীদলীয় উপমন্ত্রী সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।
আইএস এর নাম যেন মিডিয়ার সৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ ন্যাটোর ১২ টি দেশ প্রায় এক বছর যাবত যুদ্ধ করছে আইএস এর বিরুদ্ধে। অথচ তারা কিছুই করতে পারছে না। আইএস কি এতই শক্তিশালী?
তাহলে দেখা যাক রাশিয়ার হস্তক্ষেপ।সপ্তাহখানেকে মাঝে আইএসকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছে রুশ বাহিনী। এর মধ্যেই শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের আহাজারি। যুক্তরাষ্ট্রের মুখোশ আর কতভাবে উন্মোচন করতে হবে?
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ
৭ ডিসেম্বর, ১৯৪১ সালের ভোরে হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের পার্ল হারবারে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌ-ঘাঁটিতে আক্রমণ পরিচালিত করে জাপান।জাপান পরিচালিত এ বিমান আক্রমণে ১৮৮টি মার্কিন বিমান ধ্বংস হয়। নিহত হয় ২,৪০২ জন এবং আহত বা ঘায়েল হয় ১,২৮২ জন। ফলে মহাযুদ্ধে অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে আত্নপ্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্র । এই আক্রমণ ছিল অনেকটা ঘুমন্ত দৈত্যকে জাগানোর মত। পরবর্তীতে জাপান যার ফলাফল ভোগ করেছে। ৮ই মে ১৯৪৫ সালে জার্মানি মিত্রশক্তির কাছে আত্নসমর্পণ করে। তখন যুদ্ধ প্রায় শেষ পর্যায়ে। কিন্ত, ৬ ই আগস্ট এবং ৯ ই আগস্ট যথাক্রমে জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমানবিক হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ।
আর এই হামলাটি চালানো হয় জার্মানির আত্নসমর্পণের প্রায় তিন মাস পরে।কতটুকু দরকার ছিল এই বোমা হামলার? এই বোমা বিস্ফোরণের ফলে হিরোশিমাতে প্রায় ১৪০,০০০ লোক মারা যান।নাগাসাকিতে প্রায় ৭৪,০০০ লোক মারা যান এবং পরবর্তীতে এই দুই শহরে বোমার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান আরও ২১৪,০০০ জন।জাপানের আসাহি শিমবুন-এর করা হিসাব অনুযায়ী বোমার প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্ট রোগসমূহের ওপর হাসপাতাল থেকে পাওয়া তথ্য গণনায় ধরে হিরোশিমায় ২৩৭,০০০ এবং নাগাসাকিতে ১৩৫,০০০ লোকের মৃত্যু ঘটে। দুই শহরেই মৃত্যুবরণকারীদের অধিকাংশই ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তিবর্গ।

উপরের ছবিটি হিরোশিমায় বোমা হামলার পরে তোলা।বড় ভাই ছোট ভাইয়ের লাশ নিয়ে যাচ্ছে কবর দেওয়ার জন্য।
জাপানের আত্মসমর্পণের পেছনে এই বোমাবর্ষণের ভূমিকা এবং এর প্রতিক্রিয়া ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে অধিকাংশের ধারণা এই বোমাবর্ষণের ফলে যুদ্ধ অনেক মাস আগেই সমাপ্ত হয়, যার ফলে পূর্ব-পরিকল্পিত জাপান আক্রমণ (invasion) সংঘটিত হলে উভয় পক্ষের যে বিপুল প্রাণহানি হত, তা আর বাস্তবে ঘটেনি।অন্যদিকে জাপানের সাধারণ জনগণ মনে করে এই বোমাবর্ষণ অপ্রয়োজনীয় ছিল, কেননা জাপানের বেসামরিক নেতৃত্ব যুদ্ধ থামানোর জন্য গোপনে কাজ করে যাচ্ছিল।
এমন নয় যে পারমানবিক বোমার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানত না।আর এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী মনোভাব ফুটে উঠে।
অবশেষে বিপুল পরিমাণে ক্ষতির মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হল। তার মানে এই নয় যে যুদ্ধবাজ যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ করা শেষ হয়েছে।এমন নয় যে, পারমানবিক বোমার ধ্বংসলীলা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র জানত না।তাই এই হামলার কারনে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবাদী মনোভাব ফুটে উঠে। জার্মানির কারনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হলেও যুক্তরাষ্ট্রেরও ধ্বংসলীলা ভোলার নয়।
আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরপরই ১৯৪৭ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে শুরু হল শীতল যুদ্ধ (Cold War).
শীতল যুদ্ধ (Cold War):
শীতল যুদ্ধ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র সমূহ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার টানাপোড়নের নাম। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক দেশ।এর পক্ষে থাকে চীন,কিউবা।এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ছিল যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশগুলো। যা ১৯৪৭ সাল থকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছিল। অর্থাৎ, সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মাধ্যমে শেষ হয় শীতল যুদ্ধ। ১৯৯১ সালে তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তানের মত দেশগুলোর জন্ম হয়।আর এর পেছনে হাত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশে বিভিন্ন সশস্ত্র বাহিনী তৈরীতে সহায়তা করেছিল। বলা হয়ে থাকে আল-কায়দা সহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী মার্কিনীদের থেকেই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত । যারা পরবর্তীতে কালসাপে রূপান্তরিত হয়েছে।শীতল যুদ্ধ শেষ হয়েও শেষ হয়নি। এখনও রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরস্পর বিরোধী কাজকর্ম অব্যাহত রয়েছে। মাঝে মাঝেই এই দুই দেশের মধ্যে আটককৃত গুপ্তচর বিনিময় ঘটে।
বলা বাহুল্য যে, যুদ্ধ করা এবং যুদ্ধ লাগানোতে মার্কিনীদের স্বার্থ আছে।অন্যতম কারন হল, যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গুলোকে লুটেপুটে খাওয়া যায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সচল রাখার জন্য অস্ত্র বাণিজ্য অন্যতম ভূমিকা পালন করে। যদি যুদ্ধ নাই লাগে তাহলে অস্ত্র বিক্রি হবে কি করে? পৃথিবীতে অস্ত্র বাণিজ্যে শীর্ষ দেশ যুক্তরাষ্ট্র।যদিও এই নিউজটি কোন সংবাদ মাধ্যমের নয় তবুও লিখলামঃ ইউএন এর এক সামরিক কর্মকর্তার বিবৃতি অনুযায়ী, মার্কিনীদের এই অস্ত্র বাণিজ্যকে বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশে মাফিয়াও নিয়োগ করে যুক্তরাষ্ট্র।
বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারন ও ধরন নিয়ে নির্মিত হয়েছে "Dirty Wars: The World is a battlefield" নামক তথ্যচিত্রটি। লিংকঃ https://www.youtube.com/watch?v=O7UCFSbduuY

১৯৭২ সালে ভিয়েতনামে তোলা উপরের ছবিটি মনে করিয়ে দেয় সেদিন পৃথিবী কেঁদেছিল।
জাপানের আত্ন-সমর্পণের পর থেকে নতুন নতুন কাহিনী যুক্ত হতে থাকে ইতিহাসের পাতায়। যার মধ্যে কোরীয় যুদ্ধ অন্যতম। আর এই যুদ্ধকে শীতল যুদ্ধের (Cold War) অংশ মনে করা হয়।
কোরীয় যুদ্ধঃ
১৯১০ সাল থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত জাপানী সাম্রাজ্য কোরীয় উপদ্বীপ শাসন করে। আর জাপানের পরাজয়ের পর, মিত্রশক্তিরা কোরীয় উপদ্বীপটিকে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়। মার্কিন প্রশাসন উপদ্বীপটিকে ৩৮তম সমান্তরাল রেখায় ভাগ করে, এর মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনী দক্ষিণ অর্ধেক নিজেদের দখলে আনে এবং সোভিয়েত সশস্ত্র বাহিনী উত্তর অর্ধেক অধিকারে আনে।একপাশে মার্কিনীদের সহায়তায় গড়ে উঠে ডানপন্থী সরকার। আর অন্যপাশে সোভিয়েত ইউনিয়নের সহায়তায় গঠিত হয় সাম্যবাদী সরকার। যার ফলে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক ভাগের সৃষ্টি হয়। ফলে একসময় দুইপক্ষের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বার বার আলোচনা ভেস্তে যায়। অবশেষে সময়কাল ১৯৫০ সালের ২৫ শে জুন উত্তর কোরিয়া দক্ষিন কোরিয়া আক্রমন করে।রাশিয়া জাতিসংঘের অধিবেশন ত্যাগ করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের কাছ থেকে কোরিয়ায় সামরিক হস্তক্ষেপের অনুমোদন পাশ করায়। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিন কোরিয়ার হয়ে যুদ্ধে নেমে পড়ে। যাইহোক, কাজে অথবা অকাজে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ করবেই।যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে করেছিল শুধুমাত্র দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য।যার ফলে যুদ্ধ মঞ্চে প্রবেশ করে চীন। রাশিয়া রসদ দিয়ে সাহায্য করে। আর কোরীয় যুদ্ধ মারাত্নক রূপ নেয়। সবদিকে যেন লাশের মিছিল।

এই শিশুগুলো কেন ভুক্তভুগি বলতে পারেন। ওরা যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়নের সাম্রাজ্যবাদী লড়াইয়ের আগুনের শিকার। সামরিক ক্ষয়ক্ষতির কথা বাদই দিলাম। এই যুদ্ধে হতাহত হয় প্রায় পঁচিশ লক্ষ বেসামরিক মানুষ। এর জবাব কে দেবে?প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন সৈন্য নিখোঁজ হয়। তাদের কবর হয়ত উত্তর কোরিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
অবশেষে, প্রায় তিন বছর পর, দুই কোরীয়ার মধ্যে যুদ্ধ বিরিতি সাক্ষর হয়। অনেকটা সংক্ষেপিত ভাবে শেষ করলাম কোরীয় যুদ্ধের ইতিকথা। যুদ্ধ যেন শেষ হয় না। সবাই তো আর মার্কিনীদের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে যুদ্ধে নামতে পারে না। আনেকে তো শোষিত হচ্ছে তো হচ্ছেই। যাই হোক, চলে যাই ভিয়েতনাম যুদ্ধে। ১৯৫৯ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ সংঘঠিত হয়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধঃ
ভিয়েতনামের সাধারন মানুষের যেন আর মুক্তি নেই। দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধ শেষে ভিয়েতনামীরা ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে।এরপর ভিয়েতনামকে সাময়িকভাবে উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম - এই দুই ভাগে ভাগ করে দেওয়া হয়।উত্তর ভিয়েতনামে সাম্যবাদী সরকার গঠিত হয় এবং দক্ষিন ভিয়েতনামে সাম্যবাদ বিরোধীরা ডানপন্থী সরকার গঠন করে।ডানপন্থী সরকার গঠনে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করে। আর সাম্যবাদীরা চেয়েছিল সমগ্র ভিয়েতনামে একক সাম্যবাদী সরকার গঠন করতে। আবার আম্রিকা। যুক্তরাষ্ট্রের মদদ পুষ্ট দক্ষিন ভিয়েত্নামের সরকার নিপীড়নমূলক আচরণ শুরু করে। আর এই নিপীড়নমূলক আচরণের প্রতিবাদে দক্ষিণ ভিয়েতনামে আন্দোলন শুরু হয় এবং ১৯৬০ সালে দক্ষিণ ভিয়েতনামের সরকারকে উৎখাতের লক্ষ্যে ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করা হয়।১৯৬০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনাম যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি জড়িয়ে পড়ে। মার্কিনীদের জড়িয়ে পরার কারন কী জানেন? মার্কিনীদের "ডমিনো তত্ত্ব" ।ওদের এই তত্ত্বগুলোই সমগ্র বিশ্বে আগুন লাগানোর জন্য যথেষ্ট। এসব বিষয়ে পরে আলোচনা করব। চলে যাই যুদ্ধে।ধরতে গেলে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল, এই ব্যপক সময় নিয়ে চলে ভিয়েতনামের যুদ্ধ। শান্তি চুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬৯ থেকে ১৯৭৩ সালের মধ্যে প্যারিসে প্রকাশ্যে কিংবা গোপনে বেশ কিছু বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। একটির পর একটি ভেস্তে যায়। একদিকে সামরিক বাহিনী অন্য দিকে সাধারন জনগণ । এই যুদ্ধ যেন থামার নয়।তবুও, ২৩ জানুয়ারি, ১৯৭৩ সালে প্যারিসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু, কিছুদিন পর উভয় পক্ষই চুক্তি ভঙ্গ করে। আবারও, রক্তপাত। ভুক্তভুগী সাধারন মানুষ। তৎকালীন সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার আলোচনা চালাতে থাকেন। অবশেষে, ১৩ জুন, ১৯৭৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং উত্তর ভিয়েতনাম যৌথভাবে প্যারিস চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাক্ষর করে। শেষ পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জয়ী হতে পারেনি। ১৯৭৫ সালে সাম্যবাদী শাসনের অধীনে দুই ভিয়েতনাম একত্রিত হয়। ১৯৭৬ সালে এটি সরকারীভাবে ভিয়েতনাম সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নাম ধারণ করে। এই যুদ্ধে প্রায় ৩২ লক্ষ ভিয়েতনামি মারা যান। এর সাথে আরও প্রায় ১০ থেকে ১৫ লক্ষ লাও ও ক্যাম্বোডীয় জাতির লোক মারা যান। মার্কিনীদের প্রায় ৫৮ হাজার সেনা নিহত হন।যুদ্ধ যেন মৃত্যুর দূত হয়ে আসে।
ইরাক যুদ্ধঃ

মানুষের মানবিক গুণাবলী নষ্ট হওয়ার সীমাকে যে অতিক্রম করা যায়, যুক্তরাষ্ট্র তার সাক্ষী।একটি দেশ যে মিথ্যার আশ্রয় কত আয়োজন করে নিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র তার প্রমাণ। ২০০৩ সালের ২০শে মার্চ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত বাহিনীর ইরাক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হয়েছিল।ইরাক আক্রমণ করার জন্য তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি জর্জ ডব্লিউ বুশ ও কোয়ালিশন বাহিনী যে কারণ দেখিয়েছিল তা হল: ইরাক ১৯৯১ সালের চুক্তি অমান্য করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ করছে এবং তাদের কাছে এ ধরণের অস্ত্রের মজুদও আছে। তখন সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছিল, ইরাক যুক্তরাষ্ট্র, এর জনগণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য বড় ধরণের হুমকি। পরবর্তীতে এএ সমর্থক কর্মকর্তাদের প্রচণ্ড সমালোচনা করা হয়। কারণ আগ্রাসনের পরে পরিদর্শকরা ইরাকে গিয়ে কোন ধরণের গণবিধ্বংসী অস্ত্র খুঁজে পায়নি। তারা জানায়, ইরাক ১৯৯১ সালেই গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণ ত্যাগ করেছে, ইরাকের উপর থেকে আন্তর্জাতিক অনুমোদন সরিয়ে নেয়ার আগ পর্যন্ত তাদের নতুন করে গণবিধ্বংসী অস্ত্র নির্মাণের কোন পরিকল্পনাও ছিল না।এর দ্বারা যা প্রমানিত হয় তা কার কষ্ট বলার দরকার নেই।
যুক্তরাষ্ট্র এবং এর মিত্ররা ইরাক আক্রমণ করার পরপরই ইরাকী রাষ্ট্রপতি সাদ্দাম হোসেন পালিয়ে বেড়ায়।অবশেষে ২০০৩ সালের ডিসেম্বরে তাকে আটক করা হয় এবং ২০০৬ এর ডিসেম্বরে সাদ্দামের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
এরপর সুন্নি এবং শিয়া দলগুলোর মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং আল-কায়েদা ইরাকে তাদের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে। এই যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা আনুমানিক ১৫০,০০০ থেকে ১০ লক্ষের বেশী।মানুষ যেন আর মানুষ থাকে না।
আফগানিস্থান যুদ্ধঃ
যুদ্ধের আগে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আফগানিস্থানের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালই ছিল।যুদ্ধ আফগানিস্থানকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
আফগানিস্থান যুদ্ধ শুরু ১৯৭৯ সালে “ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক্স” (USSR) এর সামরিক বাহিনী এবং আফগানিস্তানের কম্যুনিস্ট-বিরোধী গেরিলাদের মধ্যে।মুক্তির আন্দোলন হিসেবে যুদ্ধ শুরু হলেও পরবর্তীতে এই যুদ্ধ আফগানিস্থানকে খাদে ফেলে দেয়।যুক্তরাষ্ট্রের সৃষ্টি করা জঙ্গীরা দেশটিকে যেন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করেছে। এখন নাকি মার্কিনীরাই আফগান সরকারকে সহায়তা করছে জঙ্গীদের থেকে বাঁচতে।এ যেন হাস্যকর ব্যাপার।
বর্তমান সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে না বললেই নয়। আরব বসন্ত শুরু হয়েছে শত মানুষের রক্তপাত ঘটিয়ে। হোসনি মোবারকের পতন, গাদ্দাফীর হত্যাকাণ্ড যার সাথে সিরিয়ার ক্ষুধার্ত শিশুরা চিৎকার করে উঠে। এদিকে জার্মানির বিরোধীদলীয় উপমন্ত্রী সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত অবস্থার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন।
আইএস এর নাম যেন মিডিয়ার সৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কসহ ন্যাটোর ১২ টি দেশ প্রায় এক বছর যাবত যুদ্ধ করছে আইএস এর বিরুদ্ধে। অথচ তারা কিছুই করতে পারছে না। আইএস কি এতই শক্তিশালী?
তাহলে দেখা যাক রাশিয়ার হস্তক্ষেপ।সপ্তাহখানেকে মাঝে আইএসকে প্রায় কোণঠাসা করে ফেলেছে রুশ বাহিনী। এর মধ্যেই শোনা যায় যুক্তরাষ্ট্রের আহাজারি। যুক্তরাষ্ট্রের মুখোশ আর কতভাবে উন্মোচন করতে হবে?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন